অ্যান্টি-ম্যালেরিয়া ড্রাইভের মারাত্মক পরিণতি! ক্লোরোকুইন ট্যাবলেট খেয়ে ৭ বছরের আদিবাসী শিশুর রহস্যমৃত্যু!

অন্ধ্রপ্রদেশের পোলারাম জেলার এত্তাপাকা মণ্ডলের দূরবর্তী গুলাগুপ্পা গ্রামে একটি সরকারি অ্যান্টি-ম্যালেরিয়া ড্রাইভের সময় ক্লোরোকুইন ট্যাবলেট সেবনের পর এক ৭ বছর বয়সী আদিবাসী শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই বিপজ্জনক ঘটনার জেরে ৪৭ জন শিশুসহ মোট ৫২ জন গ্রামবাসীকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক ঘটনায় গোটা রাজ্যজুড়ে স্বাস্থ্য বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের অন্দরে ব্যাপক শোরগোল ও হুলস্থূল পড়ে গেছে। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের একাধিক বিশেষ দল বর্তমানে সংশ্লিষ্ট গ্রাম এবং বিভিন্ন হাসপাতালে ডেরা বেঁধে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে প্রকাশ, গত মঙ্গলবার গুলাগুপ্পা গ্রামে বেশ কিছু ম্যালেরিয়ার রোগী শনাক্ত হওয়ার পর স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে গ্রামবাসীর মধ্যে ক্লোরোকুইনের ট্যাবলেট বিতরণ করেছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, ওই ওষুধ সেবন করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই বহু গ্রামবাসীর তীব্র শারীরিক অসুস্থতা শুরু হয়। এই আকস্মিক অসুস্থতার মাঝেই ৭ বছর বয়সী কোয়া আদিবাসী শিশু মাদিভি যমুনার রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। একটি সরকারি ওষুধ খাওয়ার পর এভাবে ছোট্ট শিশুর প্রাণহানির ঘটনায় স্বাস্থ্য দপ্তরের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত গুরুতর ও কড়া প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তবে শিশুটির মৃত্যু সরাসরি ওই ক্লোরোকুইন ট্যাবলেট খাওয়ার ফলেই হয়েছে কি না কিংবা এর পেছনে অন্য কোনো চিকিৎসাগত জটিলতা রয়েছে, সে বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত মেডিকেল উত্তর পাওয়া যায়নি।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে পোলারামের জেলা কালেক্টর কে. দিনেশ কুমার জানিয়েছেন যে মাদিভি যমুনা নামের ওই বালিকার দুর্ভাগ্যজনক প্রয়াণ ঘটেছে এবং জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা পুরো পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন। সরকারি জনসংযোগ বিভাগ বা পিআরও-র পক্ষ থেকে প্রকাশিত অফিশিয়াল প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, লক্ষ্মীপুরম প্রাইমারি হেলথ সেন্টার বা পিএইচসি-র একটি বিশেষ মেডিকেল টিম গুলাগুপ্পা গ্রামে ম্যালেরিয়ার প্রকোপের খবর পেয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্যকর্মীরা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে মোট ৭1 জন গ্রামবাসীকে ক্লোরোকুইনের প্রফিল্যাকটিক ডোজ বা ট্যাবলেট সেবন করিয়েছিলেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন পর্যন্ত গ্রামটিতে অন্তত ছটি সক্রিয় ম্যালেরিয়া পজিটিভ কেস রিপোর্ট করা হয়েছিল, যার ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোধ করতেই এই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
প্রাথমিক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়া ২৯ জন গ্রামবাসীকে, যাদের সিংহভাগই ছিল শিশু, ভদ্রাচলম সরকারি হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া আরও ২৪ জন রোগীকে এত্তাপাকা মণ্ডলের লক্ষ্মীপুরম পিএইচসি-তে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে জেলা কালেক্টরের নির্দেশমতো লক্ষ্মীপুরম থেকে আরও ২৩ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভদ্রাচলম এরিয়া হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে ভদ্রাচলমের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোট ৫২ জন গ্রামবাসীর মধ্যে ৪৭ জনই অবুঝ শিশু।
জেলা কালেক্টর নিজে সরাসরি ভদ্রাচলম সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন সমস্ত গ্রামবাসীর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছেন। চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সমস্ত রোগী বিপদমুক্ত রয়েছেন এবং তাদের শারীরিক অবস্থা সম্পূর্ণ স্থিতিশীল রয়েছে। তা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসনের বিশেষ মেডিকেল টিমগুলি গ্রামবাসীর স্বাস্থ্যের ওপর কড়া নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। ওষুধ খাওয়ার পর ঠিক কী কারণে ছোট্ট শিশুটির মৃত্যু হলো এবং বাকিরা কেন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল, তা খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু হয়েছে। ম্যালেরিয়া প্রতিরোধক এই ধরনের জীবনদায়ী ওষুধ বিতরণের সময় সঠিক নজরদারি ও গাইডলাইন মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্লোরোকুইন ট্যাবলেট ভুল মাত্রায় সেবন করা হলে বা এর ওভারডোজ হলে তা অত্যন্ত মারাত্মক ও বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে, এমনকি এর জেরে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ প্রশাসন বা এফডিএ-র তথ্য অনুযায়ী, ক্লোরোকুইন অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে প্রবল বমি, চেতনা হারানো, খিঁচুনি, রক্তচাপ আকস্মিক পতন এবং বিপজ্জনক হৃদরোগজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শমতো সঠিক ডোজে এই ওষুধ ম্যালেরিয়া নিরাময় বা প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকরী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই পোলারামের এই নির্দিষ্ট ঘটনায় কেবল ক্লোরোকুইনকেই এককভাবে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া বৈজ্ঞানিকসম্মত নয়, একমাত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ মেডিকেল ও সরকারি তদন্ত শেষ হলেই প্রকৃত সত্য সামনে আসবে।