“আমার ৬ হাজার কোটি থেকে উদ্ধার ১৪ হাজার কোটি, আর সুভাষ…” ঋণের মওকুফ নিয়ে বিস্ফোরক বিজয় মালিয়া!

জি গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ চন্দ্রের ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ মাত্র সাড়ে ৬ কোটি টাকায় নিষ্পত্তির জন্য ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল বা NCLT-র সায় দেওয়া নিয়ে দেশজুড়ে জবরদস্ত বিতর্ক শুরু হয়েছে। আর এই পুরো পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এবার ভারতের ঋণ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুললেন পলাতক শিল্পপতি বিজয় মালিয়া (Vijay Mallya on Subhas Chandra)। সুভাষ চন্দ্রকে নিজের ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করে কটাক্ষের সুরে তিনি নিজের মামলার সঙ্গে এই ঘটনার তুলনা টেনেছেন।
এক্স হ্যান্ডলে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বিজয় মালিয়া লিখেছেন, “এটি সত্যি হলে আমার বন্ধু সুভাষকে অনেক অভিনন্দন। ব্যাঙ্ক এবং সরকার স্বীকার করেছে যে, আমার ৬,২০৩ কোটি টাকার জাজমেন্ট ডেটের বিপরীতে ১৪,১০০ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। অথচ আরও অনেক ঋণগ্রহীতা তাঁদের মোট ঋণের সামান্য অংশ দিয়েই সমস্ত দায় থেকে মুক্তি পাচ্ছেন। আমার ধারণা, এটাই ভারতীয় ঋণ নিষ্পত্তির আসল বিচার! আর এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমেরও কোনো প্রশ্ন নেই।” মালিয়ার এই মন্তব্যের আড়ালে তীব্র শ্লেষ ও ক্ষোভ স্পষ্ট, যেখানে তিনি দাবি করেছেন যে তাঁর কাছ থেকে আদালতের নির্ধারিত পাওনার দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ আদায় করা হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে সামান্য টাকায় ঋণ মাফ করে দেওয়া হচ্ছে।
সুভাষ চন্দ্রের ঋণ নিষ্পত্তির হিসাব ও NCLT-র যুক্তি
আইনি প্রক্রিয়ায় সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থার মোট ২২,০০৬.৫৭ কোটি টাকার দাবি স্বীকৃত হয়েছিল। কিন্তু তাঁর পেশ করা ঋণ পরিশোধের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঋণদাতাদের মাত্র ৬.৫ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়। এর ফলে ঋণদাতাদের প্রতি ১০০ টাকা পাওনার বিপরীতে মাত্র ৩ পয়সার কাছাকাছি ফেরত পাওয়ার কথা, অর্থাৎ তাঁদের প্রায় ৯৯.৯৭ শতাংশ পাওনা মওকুফ বা ‘হেয়ারকাট’ হিসেবে বাদ চলে যাচ্ছে। এলআইসি হাউজিং ফিনান্স (LIC Housing Finance)-এর মতো কিছু সংস্থা এর তীব্র বিরোধিতা করলেও, ৮০.৮১ শতাংশ ভোটাধিকারের প্রতিনিধিত্বকারী ঋণদাতারা এই প্রস্তাবের পক্ষেই ভোট দেন।
মামলাটি NCLT-র তৃতীয় সদস্য নীলেশ শর্মার কাছে পৌঁছালে, তিনি ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাঙ্করাপসি কোডের ১১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই পরিকল্পনা অনুমোদন করেন। ট্রাইব্যুনালের বক্তব্য ছিল, ঋণদাতাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যখন বাণিজ্যিক দিক বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্তে সম্মত হয়েছেন, তখন ট্রাইব্যুনাল নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে পারে না। তাছাড়া সুভাষ চন্দ্রের বর্তমান সম্পত্তির মূল্যায়নও ওই সাড়ে ৬ কোটি টাকার তুলনায় কম। তাই পরিকল্পনাটি খারিজ করে তাঁকে দেউলিয়া ঘোষণা করলে ঋণদাতারা আরও কম অর্থ পেতে পারেন—এই যুক্তির ভিত্তিতেই প্রস্তাবটি মঞ্জুর করা হয়েছে।
মালিয়ার দাবি বনাম আইনি বাস্তবতা
এর আগেও বিজয় মালিয়া দাবি করেছিলেন যে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সংসদে জানিয়েছিলেন যে তাঁর বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি ১৪,১৩১.৬০ কোটি টাকা উদ্ধার করেছে। মালিয়ার প্রশ্ন ছিল, তাঁর ‘জাজমেন্ট ডেট’ যদি ৬,২০৩ কোটি টাকা হয়, তবে অতিরিক্ত উদ্ধার হওয়া অর্থ কোথায় গেল?
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত দেউলিয়ার প্রক্রিয়া এবং বিজয় মালিয়ার বিরুদ্ধে চলা আর্থিক দুর্নীতির মামলা সম্পূর্ণ আলাদা। মালিয়াকে ইতিমধ্যেই ভারতে ‘পলাতক আর্থিক অপরাধী’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ব্যাঙ্ক জালিয়াতি ও অর্থপাচারের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তা সত্ত্বেও, সুভাষ চন্দ্রের ঋণ মওকুফের এই চাঞ্চল্যকর অঙ্ক সামনে আসতেই ভারতের ঋণ আদায় ও আইনি ব্যবস্থার সমতা নিয়ে বড়োসড় প্রশ্ন তুলে দিলেন লিকার ব্যারন বিজয় মালিয়া।