‘রাজনীতি থাক, জলবায়ু বাঁচাতে এক হোক চার দেশ!’ প্রলয় আসন্ন বুঝেই ভারতকে বড় বার্তা শিশির খানালের!

হিমালয় অঞ্চলের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের (Nepal Flash Flood) অভিন্ন বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভারত ও নেপালের দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ককে সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করার আহ্বান জানিয়েছেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল (Shishir Khanal)। সম্প্রতি তিব্বত-নেপাল সীমান্তে ভয়াবহ হিমবাহ ধসের জেরে সৃষ্টি হওয়া বিধ্বংসী হড়পা বানের কথা উল্লেখ করে তিনি অত্যন্ত জোরালো সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই মারাত্মক ও ভয়ংকর ধাক্কা কেবল একটি নির্দিষ্ট দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অস্তিত্বকেই গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।

নয়াদিল্লিতে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় নেপালের বিদেশমন্ত্রী বলেন, “ভারত ও নেপালের ঐতিহাসিক ও প্রাচীন সম্পর্ককে আমরা বরাবরই ‘রুটি-বেটি’ কিংবা ‘সীতা-রাম’-এর আত্মিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন দিয়ে ব্যাখ্যা করে এসেছি। আমাদের ধর্মীয় ও সভ্যতার মেলবন্ধন অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রদ্ধার, কিন্তু বর্তমান সময়ের পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্ককে পরিবেশগত ও বাস্তুতান্ত্রিক সুরক্ষার মাপকাঠিতে নতুনভাবে সাজানো এখন সময়ের দাবি।”

গত বুধবার ঘটে যাওয়া নেপালের ভয়ঙ্কর বন্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “হিমালয়ে যা কিছু গলে, তা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়েই মেশে—এই চরম সত্য আমরা সদ্য বিগত বুধবারে চাক্ষুষ করেছি। তিব্বত-নেপাল সীমান্তের উচ্চ হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও হ্রদ বিস্ফোরণের ফলে ধেয়ে আসা জলের প্রচণ্ড স্রোত নেপালের একের পর এক জনপদ মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিয়েছে।”

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর তীব্র জোর দিয়ে খানাল উল্লেখ করেন, ভাগ্যক্রমে এই বারের বন্যার কাদার স্রোত নেপাল সীমান্ত পার হয়ে ভারতের নীচের দিকে অতটা ব্যাপকভাবে ছড়ায়নি, যার ফলে সীমান্ত সংলগ্ন ভারতীয় এলাকাগুলি একটি বড়সড় ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছে। তবে অতীতে বহুবার এমন বিপর্যয়ের প্রলয়ঙ্করী ঢেউ ভারতে এসে আছড়ে পড়েছে এবং ভবিষ্যতেও যে পড়বে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। গণ্ডক ও কোশির মতো বড় বড় নদীগুলি নেপাল ও তিব্বতের হিমালয় অঞ্চল থেকেই উৎপন্ন হয়ে সরাসরি ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারের জনবহুল সমভূমি অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। ফলে নেপালে হড়পা বান দেখা দিলেই সীমান্ত সংলগ্ন ভারতীয় রাজ্যগুলিতে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি ও চরম আতঙ্ক তৈরি হয়।

সমস্ত রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা একপাশে সরিয়ে রেখে হিমালয় অঞ্চলের ভঙ্গুর পরিবেশ রক্ষায় প্রতিবেশী দেশগুলিকে অবিলম্বে এক ছাতার তলায় আসার আহ্বান জানান শিশির খানাল। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জোর দিয়ে বলেন, “চিন, নেপাল, ভারত এবং ভুটান—এই চার দেশই পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের সুতোয় একে অপরের সঙ্গে শক্ত করে বাধা। এই অঞ্চলে আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যৎ এবং বেঁচে থাকা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে হিমালয় পর্বতমালাকে রক্ষা করার ওপর। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এই অস্তিত্বের লড়াইয়ে আমাদের একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতেই হবে।”

বিদেশমন্ত্রী আরও মারাত্মক সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন যে, হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ার এই বিপজ্জনক ধারা আগামী দিনে বজায় থাকলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জন্য পানীয় ও বিশুদ্ধ জলের চরম সংকট দেখা দেবে। এটিকে সমগ্র মানব সভ্যতার জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি অবিলম্বে যৌথ ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন।