তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বান! জলের তোড়ে ভেসে গেল একাধিক গ্রাম, মৃত অন্তত ৮!

তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের একটি পাহাড়ি অঞ্চলে নেমে এল এক ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আকস্মিক হড়পা বানের তীব্র স্রোতে নিমেষের মধ্যে ভেসে গিয়েছে একাধিক গ্রাম এবং নদী তীরবর্তী এলাকার বেশ কিছু নির্মীয়মাণ পরিকাঠামো। সরকারি সূত্রে প্রাপ্ত প্রাথমিক খবর অনুযায়ী, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত অন্তত আট জনের প্রাণহানির নিশ্চিত খবর মিলেছে। পাশাপাশি, নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত নয় জন সাধারণ মানুষ। হঠাৎ করে নদীগুলির জলস্তর বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন চরম সতর্কতা জারি করেছে এবং নদী তীরবর্তী ও নিচু অঞ্চলে বসবাসকারী বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানগুলিতে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্গত এলাকায় দ্রুত উদ্ধারকাজ চালাতে ইতিমধ্যেই নামানো হয়েছে বিশেষ হেলিকপ্টার, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর জওয়ানদের।
প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য জেলা রাসুয়ার অধীনে থাকা স্যাপ্রু বেসি এবং টিমুরে এলাকাটি এই ভয়ংকর হড়পা বানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবল জলোচ্ছ্বাসের মুখে পড়েছে ভোতে কোশী নদীর তীরবর্তী জনবসতিগুলি। জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বিস্তীর্ণ গ্রাম ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো তৈরির বেশ কয়েকটি প্রকল্প এলাকা সম্পূর্ণ জলের তলায় তলিয়ে গেছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম যোগাযোগের কারণে এই মুহূর্তে ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান যে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিপুল হতে পারে, যদিও সুনির্দিষ্ট তথ্যের জন্য আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।
পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ নিজে গোটা বিষয়টির ওপর কড়া নজর রাখছেন। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালানোর জন্য সরকারি বিশেষ দল ইতিমধ্যেই দুর্গত এলাকায় পৌঁছে গেছে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, নদীর নিচু এলাকায় আটকে থাকা সমস্ত বাসিন্দাকে অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এছাড়াও সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকার এবং নদীর গতিপ্রকৃতির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, রাসুয়া অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে চলা ভোতে কোশী নদীর উৎপত্তি হয়েছে প্রতিবেশী দেশ তিব্বতে। উৎপত্তিস্থল থেকে প্রবাহিত হয়ে নদীটি নেপালের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে এবং পরে বিখ্যাত ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পরবর্তীতে এই জলধারা ভারতের দিকে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গার অন্যতম প্রধান উপনদী গণ্ডকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। নদীটির ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এর জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়া খুবই সংবেদনশীল। স্মর্তব্য, গত বছরও ঠিক একই নদীর ভয়ংকর বন্যায় প্রায় নয় জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং চব্বিশ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। সেবার সেই প্রলয়ঙ্কারী বন্যায় ভারত ও চিনের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ঐতিহাসিক ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ বা মৈত্রী সেতুটি জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছিল। যার ফলে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে ওই আন্তর্জাতিক অঞ্চলের সঙ্গে সমস্ত রকম পরিবহন ও বাণিজ্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিব্বতের হিমবাহ অঞ্চলের উপরিভাগে থাকা হ্রদের অতিরিক্ত জল বেরিয়ে আসার ফলেই এই ধরনের আকস্মিক বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।