কংগ্রেসের নিয়মই শেষ কথা! ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে ডি কে শিবকুমারের মন্তব্যে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা

‘বন্দে মাতরম’ গান পরিবেশন ঘিরে দেশজুড়ে চলমান রাজনৈতিক টানাপড়েনের মাঝেই এবার নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকারি এবং যে কোনো জাতীয় অনুষ্ঠানে এবার থেকে কংগ্রেস দলের নির্দেশ ও সিদ্ধান্তই কঠোরভাবে মেনে চলবে কর্নাটক সরকার। অর্থাৎ, এখন থেকে সরকারি মঞ্চে ‘বন্দে মাতরম’-এর মাত্র প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া হবে। সম্প্রতি স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে কর্নাটকে জাতীয় সংগীতের আদলে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবকই গাওয়ার প্রসঙ্গটি সামনে আসার পরই রাজ্যজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে মুখ খুলে শিবকুমার জানান যে, ওই ঘটনাটি তাঁর সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে ঘটেছিল এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়ে দলের নির্ধারিত নিয়মই চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হবে।

বুধবার একটি বিশেষ আলোচনা সভায় এপ্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী দৃঢ় কন্ঠে জানান যে, দলের আদর্শ এবং কাঠামোর প্রতি তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘‘দল যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমি সর্বদাই তার পাশেই রয়েছি।’’ তাঁর দাবি, অতীতে হয়তো অজান্তে কিংবা রাজভবনের কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে ছয়টি স্তবক গাওয়া হয়ে থাকতে পারে, তবে আগামী দিনে কর্নাটক সরকারের সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠানে পুরনো সিদ্ধান্ত বজায় রেখেই কেবল প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে।

উল্লেখ্য, জাতীয় স্তরে ‘বন্দে মাতরম’ গানটির সমস্ত স্তবক গাওয়া বাধ্যতামূলক করা নিয়ে একটি নতুন ‘বন্দে মাতরম বিল’ আসার পরই কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতর চরমে পৌঁছায়। এর মাঝেই কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি (CWC) ১৯৩৭ সালের পুরনো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে পুনর্বহাল করে সাফ জানিয়ে দেয় যে, যেকোনো জনসমাবেশ বা জাতীয় অনুষ্ঠানে জাতীয় গান হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া উচিত। কংগ্রেসের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণ। দলের যুক্তি অনুযায়ী, এই গানের পরবর্তী স্তবকগুলিতে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী এবং সরস্বতীর মতো হিন্দু দেব-দেবীদের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ফলে ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই অংশগুলি আপত্তিকর বা বিভাজক মনে হতে পারে। বিপরীতে, প্রথম দুটি স্তবকে নিছক দেশমাতৃকার বন্দনা থাকায় তা দেশের সমস্ত ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে সমানভাবে সর্বজনগ্রাহ্য। তাই ধর্মনিরপেক্ষতার খাতিরে প্রথম দুটি স্তবককেই বেছে নিয়েছে দল।

অন্যদিকে, কংগ্রেসের এই অবস্থানকে হাতিয়ার করে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে বিরোধী দল বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের জোরালো অভিযোগ, কংগ্রেস পার্টি বরাবরই জাতীয় স্তোত্র ও দেশপ্রেমের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে আসছে এবং এর নেপথ্যে কাজ করছে তাদের দীর্ঘদিনের তুষ্টিকরণ ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি। তবে বিজেপির সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন যে, ভারত বহুমুখী সংস্কৃতি, ভাষা ও জাতির একটি দেশ, যেখানে সমাজের প্রতিটি অংশকে একসঙ্গে নিয়ে চলাটাই কংগ্রেসের মূল রাজনৈতিক আদর্শ। উলটো দিকে বিজেপির বিরুদ্ধেই তোষণের রাজনীতির অভিযোগ তোলেন তিনি। পাশাপাশি, হিন্দু এবং হিন্দুত্ব সংক্রান্ত বিভিন্ন বিতর্কের জবাবে ডি কে শিবকুমার মন্তব্য করেন যে, দেশের প্রকৃত বৈচিত্র্যকে সম্মান জানানোই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। তাঁর মতে, সূর্য, জল কিংবা বাতাসের মতো মৌলিক উপাদানের কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম হয় না; দেশের প্রতিটি নাগরিককে একই বাতাসে শ্বাস নিতে এবং একই জল পান করতে হয়। তাই ধর্মের সংকীর্ণ বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাকে সম্মান করার বার্তা দিয়েছেন তিনি।