মার্কিন ভিসানীতিতে তুলকালাম! নতুন এই বিশাল ফিতে কি তবে আমেরিকায় চাকরি হারাতে চলেছেন ভারতীয়রা?

আমেরিকায় উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের প্রবেশাধিকার এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এক সম্ভাব্য বড় ধাক্কার পূর্বাভাস মিলল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS)-এর পক্ষ থেকে এইচ-১বি (H1-B) ভিসার আবেদন ফি বাবদ এক লাফে অতিরিক্ত ১,০৩,২৬৫ মার্কিন ডলার—যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯৮ লক্ষ টাকা—প্রস্তাব করার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। এই বিশাল পরিমাণ ফি আরোপের কঠোর সমালোচনা করে কড়া ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত-মার্কিন অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘ফাউন্ডেশন ফর ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ডায়াসপোরা স্টাডিজ’ (FIIDS)। তাদের দ্ব্যর্থহীন দাবি, মার্কিন সরকারের এই অবাস্তব ও খামখেয়ালি পদক্ষেপের ফলে মার্কিন মুলুকের বহু লাভজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ ও টেক জায়ান্টদের অপারেশন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার জোরালো ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এইচ-১বি ভিসার কোটা বা সীমাবদ্ধতার আওতাভুক্ত সমস্ত আবেদনের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ফি প্রযোজ্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা উচ্চতর ডিগ্রির কারণে ছাড় পাওয়া আবেদনগুলোর ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। FIIDS-এর পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির প্রধান খাণ্ডেরাও কান্দ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ এক বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা, জালিয়াতি রোধ কিংবা বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া মসৃণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট মার্কিন সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত আর্থিক সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু একটি ভিসার জন্য ১,০৩,২৬৫ ডলারের মতো আকাশছোঁয়া ফি আদায়ের সিদ্ধান্ত আর্থিক সংকটে জর্জরিত উঠতি স্টার্টআপগুলোর জন্য সাক্ষাৎ মরণবাণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে, যে সমস্ত বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে হাজার হাজার বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে, তাদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা কয়েকশো মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে এক বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়। খাণ্ডেরাও কান্দ আরও সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, এর সঙ্গে যদি সম্ভাব্য ১,০০,০৮০ ডলারের ওপিটি (OPT) ফি যুক্ত হয়, তবে মোট খরচ এক ধাক্কায় গিয়ে ঠেকবে ২,০৩,২৬৫ ডলারে। এর ফলস্বরূপ, মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের গ্র্যাজুয়েশন বা পড়াশোনা শেষ করে সে দেশের মূলস্রোতের কর্মজীবনে প্রবেশের পথটি কার্যত আকাশছোঁয়া ব্যয়বহুল হয়ে পড়ব এবং তা সাধারণ মেধার নাগালের বাইরে চলে যাবে। উদ্ভূত এই সংকটময় পরিস্থিতিতে FIIDS-এর পক্ষ থেকে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS) এবং ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (USCIS)-এর প্রতি জোরদার আহ্বান জানানো হয়েছে, যেন তারা তহবিল সংগ্রহের জন্য এই ধরনের ধ্বংসাত্মক পদ্ধতির পরিবর্তে আরও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত পথ বেছে নেয়। একই সঙ্গে মার্কিন কংগ্রেস এবং শিল্পখাতের শীর্ষ কর্তাদের প্রতিও বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে একদিকে যেমন আমেরিকার নিজস্ব কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে, তেমনই অন্যদিকে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে মার্কিন নেতৃত্ব বজায় রাখতে বৈশ্বিক মেধার মূল্যায়নও যথাযথভাবে অক্ষুণ্ণ থাকে।
বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এমন একটি সময় এই বিতর্কিত প্রস্তাবটি সামনে আনা হয়েছে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগমনের প্রবাহে ইতিমধ্যেই স্পষ্ট দুর্বলতার লক্ষণ ফুটে উঠতে শুরু করেছে। ‘ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন’-এর সাম্প্রতিক তথ্য তুলে ধরে FIIDS জানিয়েছে যে, ২০২৫ সালের শরৎকালেই মার্কিন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির হার এক লাফে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। এখানেই শেষ নয়, স্বনামধন্য সংস্থা ‘নাফসা’ (NAFSA)-র ২০২৬ সালের একটি প্রক্ষেপণমূলক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ধরনের কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে অদূর ভবিষ্যতে মার্কিন মুলুকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১,১১,০০০ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এর জেরে সামগ্রিক ছাত্রভর্তির হার ৯.৫ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার ফলে মার্কিন অর্থনীতিকে প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। সংস্থাটি আরও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ইউসিআইএস (USCIS) ইতিমধ্যেই তাদের বার্ষিক প্রয়োজনীয় তহবিলের প্রায় ৯৬ শতাংশই আবেদনকারী ও পিটিশন দাখিলকারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত ফি-র মাধ্যমে মেটায়, ফলে এই অতিরিক্ত ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কেবল অবিবেচকের মতো চাপিয়ে দেওয়া এক অর্থনৈতিক চাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।