দেশ ধর্মশালা নয়! অনুপ্রবেশ রুখতে মোদী সরকারের মেগা মাস্টারপ্ল্যান আনলেন অমিত শাহ!

২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে এক সম্পূর্ণ উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার যে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তার মূল ভিত্তি হিসেবে দেশের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত গোয়েন্দা ব্যুরো (IB)-এর মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে দেশের আগামী দুই দশকের এক বিশাল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্লুপ্রিন্ট পেশ করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দেশের সীমান্ত সুরক্ষাকে সুদৃঢ় করতে এবং অনুপ্রবেশ, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার ও আধুনিক প্রযুক্তির নিত্যনতুন আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে একযোগে আগাম প্রতিরোধমূলক কৌশল গ্রহণের অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা দিয়েছেন তিনি।
এদিনের সম্মেলনে দেশের সীমানা সুরক্ষার প্রসঙ্গ টেনে অত্যন্ত কড়া ভাষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, “এই দেশটা কোনো ধর্মশালা নয়।” সীমান্ত নিরাপত্তাকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি জানান যে, গত আট মাস ধরে ভারতের সমস্ত স্থলসীমান্তবর্তী রাজ্যগুলির সঙ্গে দফায় দফায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও আলোচনা চালিয়েছে কেন্দ্র। রাজ্যগুলির সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট চার স্তম্ভের সমন্বিত সীমান্ত সুরক্ষা কাঠামো ভাগ করে নেওয়া হয়েছে, যার সর্বপ্রধান উদ্দেশ্য হলো যত দ্রুত সম্ভব দেশকে সম্পূর্ণরূপে অনুপ্রবেশকারী-মুক্ত করে তোলা। তাঁর মতে, বেআইনি অনুপ্রবেশকারীরা কেবল জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং সুষম জনসংখ্যার ভারসাম্যের (ডেমোগ্রাফি) জন্য এক মারাত্মক ও বিপজ্জনক হুমকি।
পূর্বতন সরকারগুলির দীর্ঘমেয়াদী নীতির কড়া সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে, অতীতের শাসকদলগুলির দূরদর্শিতার বড় অভাব ছিল। যদি পূর্ববর্তী সরকারগুলি মাদক পাচার, নকশালবাদ কিংবা উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির অশান্তি ও বিচ্ছিন্নতাবাদকে শুরুতেই কঠোরহস্তে প্রতিহত করার উদ্যোগ নিত, তবে আজকের স্বাধীন ভারতকে এত দশক ধরে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সংকটের মুখোমুখি হতে হতো না। তবে বর্তমান সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী, রাজ্য পুলিশ ও সর্বভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির ত্রিমুখী যৌথ প্রচেষ্টায় দেশের তিনটি প্রধান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ‘হটস্পট’ এলাকাকে সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ ও মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
দেশের অপরাধ দমন ও বিচার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করার কথা বলতে গিয়ে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার ঐতিহাসিক সংস্কারের প্রসঙ্গ তোলেন অমিত শাহ। তিনি জানান যে, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের তিনটি নতুন অপরাধ আইনকে একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে পুরোপুরি কার্যকর করাই কেন্দ্রের এখন অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর ফলস্বরূপ বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রিতা ঘুচে গিয়ে নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যে কোনো মামলার চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি সর্বোচ্চ তিন বছরের মধ্যে করা নিশ্চিত করা যাবে এবং এর মাধ্যমে অপরাধীদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার হার বা কনভিকশন রেট অন্তত ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
মাদক পাচারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে নিষিদ্ধ চরমপন্থী সংগঠন পিএফআই (PFI)-এর বিরুদ্ধে কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বিত নিরাপত্তা অভিযানকে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। সমস্ত রাজ্যকে ‘নারকোটিক্স কন্ট্রোল ভিশন ডকুমেন্ট ২০২৬-২০২৯’ মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানান যে, ‘শনাক্তকরণ, বিঘ্ন ঘটানো এবং ধ্বংস করা’ বা ‘ডিটেক্ট, ডিসরাপ্ট অ্যান্ড ডেস্ট্রয়’—এই ত্রিফলা নীতির মাধ্যমেই দেশ থেকে মাদক পাচার চিরতরে নির্মূল করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণ পুলিশ ও গোয়েন্দা আধিকারিকদের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), ডেটা ইন্টিগ্রেশন এবং আধুনিক আচরণগত বিশ্লেষণের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। অর্থনৈতিক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে সরকারের বড় সাফল্যের কথা উল্লেখ করে শাহ জানান যে, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রায় ২৭৪ জন কুখ্যাত অর্থনৈতিক অপরাধী ও পলাতককে বিদেশ থেকে ভারতে সফলভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।