বকেয়া মজুরি চাইতে গিয়ে মার খেলেন কাঠমিস্ত্রি! কাঠগড়ায় তৃণমূলের তারকা বিধায়ক সোহম চক্রবর্তী!

অভিনেতা এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেতা সোহম চক্রবর্তীকে ঘিরে ফের একবার রাজ্য রাজনীতি ও টলিপাড়ায় তীব্র বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এবার তাঁর বিরুদ্ধে এক গরিব কাঠমিস্ত্রিকে বেধড়ক মারধর করা, গুরুতর হুমকি দেওয়া এবং জোর করে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বেহালায় অভিনেতার নিজস্ব ফ্ল্যাটে কাঠের কাজের বকেয়া পারিশ্রমিকের টাকা চাইতে গিয়েই এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছেন স্বয়ং অভিযোগকারী। কাঠমিস্ত্রির করা সেই লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই ইতিমধ্যে বেহালা থানায় নির্দিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
অভিযোগকারী রাজ কাপুর শর্মার সুনির্দিষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, অভিনেতা সোহম চক্রবর্তীর বাড়িতে কাঠের আসবাবপত্র এবং আলমারি তৈরির মূল কাজের দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজের চুক্তির অঙ্ক নিয়ে সামান্য গরমিল থাকলেও অভিযোগকারীর স্পষ্ট দাবি, কাজ শুরু হওয়ার সময় তাঁকে মাত্র ৩০ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে কাজ অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পরেও তাঁর বাকি পারিশ্রমিক নিয়মিতভাবে মেটানো হচ্ছিল না। এর মাঝেই তাঁকে অতিরিক্ত আরও দু’টি আলমারি তৈরির কাজও অর্পণ করা হয়। সেই নতুন কাজেরও একটি বড় অংশ সফলভাবে শেষ করার পর রাজ কাপুর শর্মা তাঁর দীর্ঘদিনের বকেয়া টাকা চাইতে গেলে আসল সমস্যার সূত্রপাত হয়।
রাজ কাপুর শর্মার অভিযোগপত্রে আরও চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে যে, টানা প্রায় দেড় মাস ধরে নিখুঁতভাবে কাজ করার পর তাঁর মোট পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭৯ হাজার টাকা। কিন্তু বারবার পাওনা টাকার তাগাদা দিলেও তাঁকে শুধুমাত্র ঝুলিয়ে রাখা হতো এবং অযথা অপেক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হতো। এরপর গত ২৪ আগস্ট সোহমের নিজস্ব আবাসনের এক নিরাপত্তারক্ষীর ফোন পেয়ে তিনি বাধ্য হয়ে অভিনেতার ফ্ল্যাটে উপস্থিত হন। সেখানে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থাকার পর তাঁকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তাঁর কাজের জন্য আর কোনো অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হবে না। এরপর বকেয়া টাকা অবিলম্বে মিটিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি বিনীতভাবে অনুরোধ জানালে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
অভিযোগপত্রে রাজ দাবি করেছেন যে, ঠিক সেই মুহূর্তে অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী এবং টোটন সরদার নামে অপর এক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে অকথ্য গালিগালাজ ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। তাঁকে এলোপাথাড়ি ঘুষি ও চড়-থাপ্পড় মারা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন। এমনকী ভবিষ্যতে মুখ খুললে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। মারধরের ওই আকস্মিক ঘটনার সময় তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও জোর করে কেড়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন রাজ। এই বর্বরোচিত মারধরের ঘটনায় তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন বলে দাবি করে পরে তিনি সোজা বেহালা থানায় উপস্থিত হয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
পুলিশ সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে যে, অভিযোগকারীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১২৬(২), ১১৫(২), ৩৫১(২), ৫৪ এবং ৩০৩(২) ধারার মতো কঠোর ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। বর্তমানে পুলিশ অভিযোগের প্রতিটি খুটিনাটি দিক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখছে। প্রয়োজনে এই ঘটনায় অভিযুক্তদের ডেকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে পুলিশ সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে। অর্থাৎ, আপাতত সম্পূর্ণভাবে অভিযোগের ভিত্তিতেই আইনি তদন্ত এগিয়ে চলেছে, তবে অভিযোগ যে পুরোপুরি প্রমাণিত হয়েছে এমনটা এখনই বলা চলে না।
এই নতুন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই অভিনেতা সোহম চক্রবর্তীকে ঘিরে অতীতের বহু পুরনো বিতর্কও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এর আগে জুলাই মাসেও এক ব্যবসায়ী তাঁর বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ওই অভিযোগে প্রায় ৬৮ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করা এবং টাকা ফেরত চাইতে গেলে ভয়ংকর কায়দায় হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছিল। এরও আগে নিউ টাউনের একটি নামী রেস্তরাঁকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য রাস্তায় সোহমকে ঘিরে মারধরের অভিযোগ নিয়ে বিশাল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
তবে অতীতের ওই সমস্ত অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান এই মামলার আইনি দিক থেকে সরাসরি কোনো সংযোগ রয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বর্তমান এই ঘটনার ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে রয়েছে বকেয়া পারিশ্রমিকের দাবিকে কেন্দ্র করে ঠিক সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, আদৌ তাঁকে মারধর বা হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা ঠিক কতখানি। পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্ত যত এগোবে, ততই এই সমস্ত প্রশ্নের সঠিক উত্তর মিলবে। একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ তাঁর ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের ন্যায্য পারিশ্রমিক চাইতে গিয়ে যদি সত্যিই এমন পৈশাচিক আক্রমণের শিকার হয়ে থাকেন, তবে এটিকে কেবল একটি সাধারণ ব্যক্তিগত বচসা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো অবকাশ থাকে না। তবে যতক্ষণ না অভিযোগ প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ কাউকেই অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। এখন শুধুমাত্র বেহালা থানার পুলিশের সঠিক তদন্তই ফাঁস করবে সেদিন সেই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের অন্দরে ঠিক কী ঘটেছিল।