বিনা নোটিশে সোজাসুজি মস্কোয় মার্কিন গুপ্তচর প্রধান! ট্রাম্প জমানায় আমেরিকার কোন গোপন চালেল নেপথ্যে এই আকস্মিক সফর?

পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই রুশ রাজধানীতে মার্কিন বায়ুসেনার একটি বিশেষ বিমান অবতরণ করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চরম শোরগোল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত মঙ্গলবার মস্কোর ভনুকোভো বিমানবন্দরে আচমকাই উড়ে আসে আমেরিকার বিখ্যাত ‘বোয়িং সি-১৭এ গ্লোবমাস্টার থ্রি’ বিমানটি। শুরুর দিকে রুশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো তথ্য না থাকার দাবি করা হলেও, মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর বিস্ফোরক প্রতিবেদনে প্রকাশ্যে এসেছে যে, ওই বিমানে খোদ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-র বর্তমান ডিরেক্টর জন র‍্যাটক্লিফ সওয়ার ছিলেন। ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যখন বিশ্ব রাজনীতি উত্তপ্ত, ঠিক সেই মুহূর্তেই পুতিনের ঘাঁটিতে আমেরিকার সর্বোচ্চ গোয়েন্দা প্রধানের এই গোপন সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বের বিমান চলাচলের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণকারী স্বনামধন্য সংস্থা ‘ফ্লাইটরাডার-২৪’ সবার আগে এই আকস্মিক অবতরণের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনে। সংস্থাটি জানায়, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা নাগাদ মস্কোর মাটিতে পা রাখে মার্কিন বায়ুসেনার ওই বিশাল বিমানটি। বিমানবন্দরে মার্কিন কূটনীতিকদের বিলাসবহুল গাড়িও দেখা যায়। যদিও ওয়াশিংটন ও মস্কো—উভয় দেশের সরকারের পক্ষ থেকেই এই গোপনীয় সফর নিয়ে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি, তবুও মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং সিবিএস নিউজ গোটা ঘটনার আসল রহস্য ধীরে ধীরে উন্মোচন করেছে। সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআইএ প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ সম্পূর্ণ পূর্বনির্ধারিত সূচি ছাড়াই এবং চরম গোপনীয়তা বজায় রেখে মস্কোয় পৌঁছান এবং সেখানে রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় সরকারি ও সামরিক আধিকারিকদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের গোপন বৈঠকে অংশ নেন।

গোয়েন্দা প্রধানের এই সফরের গুরুত্ব এতটাই বেশি ছিল যে, মস্কো পৌঁছানোর আগেই মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়পক্ষকেই বিশেষ কূটনৈতিক বার্তা পাঠানো হয়েছিল বলে জানা যায়। সিএনএন-এর দাবি অনুযায়ী, আমেরিকা ইউক্রেনকেও যোগাযোগ করে সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য মস্কো ও রাশিয়ার উত্তরের শহরগুলিতে ড্রোন হামলা এবং ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ সম্পূর্ণ স্থগিত রাখতে বলেছিল, যাতে এই গোপন মিশনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসন গঠনের পর এই প্রথম সিআইএ প্রধানের কোনো রাশিয়া সফরের খবর প্রকাশ্যে এল। উল্লেখ্য, রাশিয়া ও ইউক্রেনের চলমান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সমাপ্তি সংক্রান্ত শান্তি আলোচনা যখন সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে, ঠিক সেই সময়ই এই বৈঠক বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এদিকে, আমেরিকার ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামক একটি নতুন প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন, যার মূল লক্ষ্য হলো ইরানের সঙ্গে একরোখা বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। উল্লেখ্য, আমেরিকার এই চোখরাঙানি ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাশিয়াও বর্তমানে ইরানের সঙ্গে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে। সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি মার্কিন গোয়েন্দা মহলের পক্ষ থেকে একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট জমা পড়েছে, যেখানে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অদূর ভবিষ্যতে ন্যাটো (NATO)-র বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া ও আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এই সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতেই সিআইএ প্রধান সরাসরি মস্কোয় গিয়ে রুশ প্রশাসনের সঙ্গে এই জরুরি বৈঠক করেছেন কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এখন জোর জল্পনা চলছে।

এর আগেও গোয়েন্দা কূটনীতির মাধ্যমে বড় বড় সংকটের সমাধান করেছে মার্কিন এই সংস্থা। প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে যে ঐতিহাসিক বন্দি বিনিময় হয়েছিল, তাতে সিআইএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আমেরিকা এবং রাশিয়ার দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা কেসেনিয়া কারেলিনার মুক্তিতে সেই সময় ব্যক্তিগতভাবে মধ্যস্থতা করেছিলেন র‍্যাটক্লিফ নিজে। এ ছাড়াও, ২০২৪ সালে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে’র প্রখ্যাত সাংবাদিক ইভান গেরশকোভিচ এবং আমেরিকান নাগরিক পল হোয়েলানের মুক্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত ছিল সিআইএ। এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বর মাসেও সিআইএ-র তৎকালীন ডিরেক্টর উইলিয়াম বার্নস মস্কো সফরে গিয়েছিলেন এবং ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে তিনি সরাসরি প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় বসেছিলেন। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে র‍্যাটক্লিফের এই সাম্প্রতিক সফর আন্তর্জাতিক শান্তি ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty