ডিগ্রি থাকলেই কি মিলবে চাকরি? নীতি আয়োগের চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে ফাঁস ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার আসল সত্যি!

ভারতে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাওয়ার লড়াইয়ে বর্তমানে শুধু একটি প্রচলিত ডিগ্রি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়। আধুনিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে টিকে থাকতে শিক্ষার্থীদের শিল্পক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা এবং সুনির্দিষ্ট দক্ষতারও একান্ত প্রয়োজন রয়েছে। সম্প্রতি নীতি আয়োগের প্রকাশিত একটি নতুন প্রতিবেদনে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মসংস্থানের মধ্যকার এই উল্লেখযোগ্য ও গভীর ব্যবধান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা এবং শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের অভাবকে তাঁদের কেরিয়ার গড়ার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মনে করেন। অন্যদিকে, প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে বর্তমানে কর্মরত ৪৭ শতাংশ মানুষের মতে, পূর্ববর্তী কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ইন্টার্নশিপের সুযোগের অভাবই তাঁদের নতুন চাকরি খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষানবিশি কার্যক্রমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ বা এমএসএমই-এর অংশগ্রহণ অত্যন্ত হতাশাজনক। নীতি আয়োগের ‘রিইমাজিনিং স্কিলস ফর এ ডেভেলপড ইন্ডিয়া @ ২০৪৭’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মানসম্মত শিক্ষানবিশ এবং ইন্টার্নশিপের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ করে, দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এমএসএমই)-গুলির অংশগ্রহণ এই ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে কম। দেশজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি নিবন্ধিত এমএসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে, কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো এর মধ্যে মাত্র ৩২,০০০ প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষানবিশ উন্নয়ন প্রকল্পের (এনএপিএস) অধীনে প্রশিক্ষণার্থী নিয়োগ করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, অতীতে ২০১৮ সালে আইটিআই প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে মাত্র ৮.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষানবিশের সুযোগ পেয়েছিল।

এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মানসম্মত শিক্ষানবিশি কর্মসূচি সম্পর্কে যথাযথ তথ্যের অভাবকে। বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সমান্তরাল কার্যক্রম অনেক সময় শিক্ষার্থী এবং নিয়োগকর্তা উভয়পক্ষের জন্যই সঠিক সুযোগ খুঁজে পাওয়া কঠিন করে তোলে।

শিল্পের সঙ্গে বাস্তব সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের ঐতিহ্যবাহী মডেল সম্পূর্ণ পরিবর্তন করার ওপর জোর দিয়েছে নীতি আয়োগ। সমস্ত কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের শিক্ষানবিশ প্রকল্পগুলির জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রদানের লক্ষ্যে প্রতিটি রাজ্যে একটি অভিন্ন ব্যবস্থা তৈরির জোরালো পরামর্শ দিয়েছে এই সরকারি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। একই সঙ্গে এটিকে দেশের ‘স্কিল ইন্ডিয়া ডিজিটাল হাব’ (এসআইডিএইচ)-এর সঙ্গে সংযুক্ত করারও বিশেষ সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, অনেক প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা বা কাগুজে বন্দোবস্তে পরিণত হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জগতের শিক্ষা এবং পেশাদারী উন্নতির পর্যাপ্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে।

ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে দক্ষতা উন্নয়নের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে প্রশাসন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আধুনিক অটোমেশন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিবেশের কারণে চাকরির বাজারের চাহিদা প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। তাই ভারতের বিশাল তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে নমনীয়, শিল্প-ভিত্তিক এবং সম্পূর্ণ কর্মসংস্থান-কেন্দ্রিক আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty