মেয়েরা কি পুতুলের মতো চলবে? ‘মনুস্মৃতি মানসিকতা’ ও পিতৃতন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ডাক রাহুল গান্ধীর!

মেয়েরা কী বলবে, কী করবে আর কোথায় যাবে—এমন কোনো রক্ষণশীল ‘নিয়ম’ বা অনুশাসন আর চলতে দেওয়া যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন কংগ্রেস নেতা তথা লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। শনিবার ছাত্রীদের সঙ্গে এক বিশেষ মতবিনিময় কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নারী স্বাধীনতা, সামাজিক বৈষম্য এবং পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালো ও আক্রমণাত্মক সুরে সওয়াল করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যকে হাতিয়ার করে সমাজ ও রাজনীতির প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে তীব্র ভাষায় কটাক্ষ করেন রাহুল।
সম্প্রতি দিল্লির যন্তর মন্তরে পেপার ফাঁসের প্রতিবাদে চলা এক বিক্ষোভে মেয়েদের মুখ থেকে কটূক্তি বা খারাপ ভাষা শুনে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ‘সাংস্কৃতিক ধাক্কা’ পেয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সেই প্রসঙ্গ টেনে রাহুল গান্ধী অত্যন্ত তীক্ষ্ণ আক্রমণ শানিয়ে প্রশ্ন তোলেন, প্রতিবাদী মিছিলে ছেলে ও মেয়ে—উভয় পক্ষই সমানভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে খারাপ ভাষা ব্যবহার করেছিল, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নজর এবং বক্তব্যে শুধুমাত্র মেয়েদের কথাই কেন বিশেষভাবে উঠে এল? রাহুল ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “ছেলেরা গাল দিলে সমাজের কোনো সমস্যা হয় না, কিন্তু কোনো মেয়ে একই কাজ করলেই তা হঠাৎ ‘সাংস্কৃতিক ধাক্কা’ হয়ে দাঁড়ায় কেন?” তাঁর মতে, এই ধরনের সংকীর্ণ ভাবনার নেপথ্যে এমন এক পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা কাজ করে, যেখানে ছেলেদের অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হলেও মেয়েদের সবসময় কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালানো হয়।
এদিন বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাহুল প্রাচীন ‘মনুস্মৃতি মানসিকতা’ ও তার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রাচীন এই গ্রন্থে নারীর জীবনকে বরাবর বাবা, স্বামী ও সন্তানের অধীনস্থ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা বর্তমান আধুনিক যুগে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। একজন স্বাধীন মহিলা কখনোই কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারেন না। তিনি সম্পূর্ণ নিজের স্বকীয়তা ও পরিচয়ে বেঁচে থাকবেন। বাবা, স্বামী বা সন্তানের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু সেই সম্পর্কই কোনো নারীর একমাত্র পরিচয় বা অস্তিত্বের মাপকাঠি হতে পারে না। দেশের তরুণী ও নারীদের নিজেদের ক্ষমতার ওপর অবিচল বিশ্বাস রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মেয়ে, স্ত্রী কিংবা মা হওয়া অত্যন্ত গর্বের বিষয় হলেও, সেটাই একজন নারীর একমাত্র পরিচয় হতে পারে না।
পিতৃতন্ত্রের কুফল সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাহুল ছাত্রীদের উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দেন যে, পিতৃতন্ত্র সবসময় নারীদের মনে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে, তাদের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রগতির পথে বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। তাই যৌথভাবে এই অন্ধকার মানসিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। তিনি স্লোগানের সুরে বলেন, “জোরে কথা বলুন, নিজের পরিচয়ে গর্বিত হন এবং সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের প্রাপ্য অধিকার ও জায়গার জন্য লড়াই চালিয়ে যান।” এছাড়া সমাজে নারীদের ওপর চলা শারীরিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার মতো গুরুতর হিংসার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। কর্মক্ষেত্রে নারীদের সমানাধিকার এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে একাধিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত এবং হরিয়ানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এমএল খট্টরের অতীতের বেশ কিছু বিতর্কিত মন্তব্যেরও কঠোর সমালোচনা করেন রাহুল।