যুদ্ধের জল্পনা তুঙ্গে! আমেরিকাকে ‘ডলারে ডলারে হিসাব চুকানোর’ হুমকি দিয়ে যুদ্ধংদেহী মেজাজে কানাডা

বিশ্ব রাজনীতিতে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনার আবহে এবার আরও এক নতুন এবং ভয়ঙ্কর যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনিয়ে আসছে। তবে কি এবার মুখোমুখি লড়াইয়ে নামতে চলেছে দীর্ঘদিনের দুই বন্ধু রাষ্ট্র আমেরিকা ও কানাডা? সম্প্রতি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির একটি বিস্ফোরক ও ঝাঁজালো মন্তব্য বিশ্বজুড়ে এক চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। অত্যন্ত ক্ষুব্ধ সুরে কার্নি হুংকার দিয়ে বলেছেন, “যখন আপনার উপর সরাসরি হামলা হয়, তখন বুঝবেন আপনি যুদ্ধে রয়েছেন। আর আমাদের উপর নির্মম হামলা চালানো হয়েছে।” এখানে তাঁর মূল নিশানা ছিল মার্কিন প্রশাসন। কিন্তু এই হামলা কোনো সশস্ত্র সামরিক আক্রমণ নয়, বরং আমেরিকার তরফ থেকে কানাডার অর্থনীতির উপর চাপানো ৫০ শতাংশ বিশাল শুল্কের খাঁড়া। এই চরম বাণিজ্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকাকে একের পর এক অগ্নিগর্ভ বার্তা দিয়ে চলেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই আপস করা হবে না। প্রতিটি ডলারের কড়ায়-ক্রান্তিতে হিসাব চুকিয়ে দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, আমেরিকার এই শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে পালটা মার্কিন পণ্যের উপর ভারী শুল্ক চাপানোর চূড়ান্ত ঘোষণা করেছেন তিনি।

কানাডার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এই পালটা শুল্ক কার্যকর করা হবে। আমেরিকা থেকে আমদানির ক্ষেত্রে দুগ্ধজাত পণ্য, ইস্পাত, গৃহস্থালির বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম, কৃষি যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স এবং পাল্প ও কাগজ-সহ একাধিক সংবেদনশীল পণ্যের উপর এই অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হবে। এর বিপরীতে, গত শনিবার থেকেই কানাডার হকি স্টিক এবং শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য সহ মোট রফতানির প্রায় ৫ শতাংশের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মূলত দীর্ঘদিন ধরে চলা আমেরিকা-কানাডা বাণিজ্য আলোচনা সম্পূর্ণভাবে ভেস্তে যাওয়ার পরই এই চরম কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক দীর্ঘ ২২ মিনিটের ভাষণে মার্ক কার্নি জানিয়েছেন যে ওয়াশিংটন যদি কানাডার পণ্যের উপর এই কঠোর শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে রাজি হতো, তবে অটোয়াও মার্কিন অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত এবং মোটরগাড়ির উপর থেকে পালটা শুল্ক প্রত্যাহার করে নেওয়ার সদিচ্ছা দেখিয়েছিল। এমনকি কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে মার্কিন মদ বিক্রির ক্ষেত্রে উৎসাহ দিতেও প্রস্তুত ছিল সরকার।

কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে শেষ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তা কানাডার সার্বভৌম সরকারের পক্ষে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে কার্নি বলেছেন, “ওরা আমাদের কাছ থেকে অসম্ভব রকমের বেশি অধিকার চেয়েছে, অথচ বিনিময়ে নামমাত্র ছাড় দিতে চেয়েছে। ওরা আমাদের সামনে যে শর্ত রেখেছে, তা আমরা যেমন মানতে পারি না, তেমনই আমাদের ন্যায্য দাবিগুলোও ওরা অস্বীকার করতে পারে না।” আমেরিকার এই অবমাননাকর শর্ত মেনে নিলে কানাডার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব চিরতরে বিপন্ন হতো এবং দেশের একাধিক মূলশিল্প ধ্বংসের মুখে পড়ত। দুই দেশের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক তিক্ততার সূত্রপাত ঘটিয়ে মার্ক কার্নি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বলেছেন, “আমরা এখন খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছি যে আমেরিকা আগের মতো আর নেই। আমেরিকার বর্তমান চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। আমরা আর কখনোই পুরনো সেই সুসম্পর্কের জায়গায় ফিরে যাচ্ছি না।” গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই বাণিজ্য বিবাদ মেটাতে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগেও ওয়াশিংটনে তিন দিন ধরে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু শেষমুহূর্তে আমেরিকার তরফ থেকে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যা অন্য দেশের সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাণিজ্য চুক্তি করার কানাডার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিত। তাই দেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করতেই বাধ্য হয়ে সমস্ত আলোচনা স্থগিত করে প্রতিনিধিদলকে দেশে ফিরিয়ে আনেন কার্নি। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে ওয়াশিংটন শুল্ক হ্রাসের সদর্থক প্রস্তাব দিলেও কানাডাই তা প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নজিরবিহীন বাণিজ্য উত্তেজনার ফলে বিশ্বখ্যাত আমেরিকা-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তি বা USMCA-র ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।