১০৫ বছর বয়সে এসে জেলমুক্তি! পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণতম বন্দি রসিক চন্দ্রের মুক্তির নেপথ্যে কোন দীর্ঘ লড়াই?

বয়সের ভারে শরীর সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, দৃষ্টিশক্তিও অনেকটাই ক্ষীণ। বার্ধক্যজনিত নানা জটিল সমস্যায় জর্জরিত শতায়ু রসিক চন্দ্র মণ্ডল। বয়সটা তো আর কম হল না, জীবনের ঘড়ির কাঁটা ১০০ পেরিয়েছে অনেক আগেই। তবে শৈশব, যৌবন, সংসার কিংবা জীবনের বাকি সব প্রতিকূলতার পেরিয়ে তাঁর জীবনের একটা বিশাল ও দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছে অন্ধকার জেলের কুঠুরিতে। অবশেষে বলা ভালো, জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে মুক্তির আলো দেখলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ কারা-ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রবীণতম বন্দি। অবশেষে ১০৫ বছর বয়সে এসে আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে তাঁর কারা-মুক্তি ঘটল।
ঠিক কী কারণে জেলে যেতে হয়েছিল রসিকচন্দ্রকে? মামলার তথ্যানুযায়ী, মালদহের বাসিন্দা রসিক চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে ১৯৮৮ সালে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে এক তীব্র বিবাদের জেরে তাঁর ভাই সুরেশ মণ্ডলকে খুনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৪ সালে নিম্ন আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। সেই সময় রসিকচন্দ্রের বয়স ছিল ৭৪ বছর। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে জেল, আদালত আর আইনি লড়াইয়ের বেড়াজালে এগোতে থাকে তাঁর জীবন। সময়ের নিজস্ব স্রোতে একসময়ের কর্মক্ষম মানুষটি ধীরে ধীরে পৌঁছে যান শতবর্ষের দোরগোড়ায়। নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ে কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু ২০১৮ সালে কলকাতা হাইকোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে তাঁর যাবজ্জীবন সাজা বহাল রাখে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ন্যায়বিচারের আশায় তাঁর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানানো হয়। ২০২০ সালে যখন তিনি দেশের শীর্ষ আদালতে আবেদন করেন, তখন তাঁর বয়স প্রায় ১০০ ছুঁইছুঁই। ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর ১০৩ বছর বয়সে তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন মুক্তি প্রদান করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তারপর থেকেই তিনি জেলের বাইরে স্বাভাবিক দিন কাটাচ্ছিলেন। অবশেষে ২০২৬ সালে এসে সুপ্রিম কোর্ট সেই মুক্তিকেই চূড়ান্ত সিলমোহর দিল। রসিকচন্দ্রের উন্নত বয়স এবং গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কথা সার্বিকভাবে বিবেচনা করে তাঁর অবশিষ্ট সাজা সম্পূর্ণরূপে মকুব করার সিদ্ধান্ত নেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ। একইসঙ্গে এই দীর্ঘস্থায়ী মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তিও ঘোষণা করেন তাঁরা।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন এই ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, এখন থেকে তিনি সম্পূর্ণ একজন স্বাধীন নাগরিকের মতো নিজের বাকি জীবন কাটাতে পারবেন। সুপ্রিম কোর্টের এই যুগান্তকারী ও মানবিক নির্দেশের ফলে ১০৫ বছরের বৃদ্ধ রসিকচন্দ্রকে আর কোনোদিনই কারাগারের চার দেওয়ালের জীবনে ফিরে যেতে হবে না। জীবনের আর যে ক’টা দিন তাঁর ভাগ্যে অবশিষ্ট রয়েছে, তা তিনি পুরোপুরি আপন খেয়ালেই কাটাতে পারবেন। এক দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং কারাবাসের পর এই মুক্তি যেন তাঁর জীবনে এক পরম প্রাপ্তি।