বৈদ্যুতিক বাসের বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য! হাজার হাজার কোটির লগ্নি এনে ভারতের ইভি বিপ্লবকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে এই সংস্থা?

আমেরিকান বিনিয়োগ সংস্থা বেইন ক্যাপিটাল ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) বাজারে একটি অন্যতম বৃহত্তম ও ঐতিহাসিক বিনিয়োগের জন্য জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর অনুযায়ী, সংস্থাটি জেবিএম অটো-র ইলেকট্রিক ভেহিকল ব্যবসায় প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২,৮৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের বিষয়ে গভীর আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগটি জেবিএম অটো-র স্বতন্ত্র ইভি ইউনিটে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘু অংশীদারিত্বের বিনিময়ে সম্পন্ন হতে পারে। বর্তমান আলোচনায় বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, ইক্যুইটি অংশীদারিত্ব এবং চুক্তির সামগ্রিক কাঠামোগত রূপরেখা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
বর্তমান ভূ-অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রেক্ষাপটে বেইন ক্যাপিটাল এই ব্যবসাটির যৌথ নিয়ন্ত্রণের বিকল্প দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এই সম্ভাব্য চুক্তিটি জেবিএম অটোকে তাদের বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবসা আরও দ্রুত ও ব্যাপক পরিসরে সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ মূলধন সরবরাহ করবে। ঐতিহ্যগতভাবে কোম্পানিটি মূলত মোটরগাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির ব্যবসায় নিজেদের নিয়োজিত রাখলেও, বর্তমান পরিবর্তিত সময়ে তারা সম্পূর্ণভাবে বৈদ্যুতিক এবং পরিবেশবান্ধব যানবাহনের দিকে নিজেদের মূল মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে।
বিশেষ করে ভারতের বৈদ্যুতিক বাসের বাজারে জেবিএম অটো ইতিমধ্যে নিজেদের একটি অপ্রতিরোধ্য ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। কোম্পানির নিজস্ব বাণিজ্যিক দাবি অনুযায়ী, ইলেকট্রিক টারম্যাক বাস সেগমেন্টে তাদের বাজার অংশীদারিত্ব প্রায় ৭৯ শতাংশ এবং আন্তঃনগর ইলেকট্রিক লাক্সারি কোচ বিভাগে এই অংশীদারিত্ব ৫০ শতাংশের গণ্ডি অনায়াসে অতিক্রম করেছে। বৈশ্বিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে তারা দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে চীনের বাইরে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সমন্বিত ইলেকট্রিক বাস উৎপাদন কারখানা স্থাপন করেছে। সরকারি নিবন্ধনের তথ্য প্রমাণ করে যে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই জেবিএম গ্রুপের প্রায় ৮০৪টি ইলেকট্রিক বাস সফলভাবে নিবন্ধিত হয়েছে। বর্তমানে এই ইভি বিজনেসটি জেবিএম অটোর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল এবং লাভজনক ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হয়েছে। চলতি অর্থবর্ষে কোম্পানিটি প্রায় ৭,০০০ থেকে ৭,৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রেখেছে, যার প্রায় ৪৫ শতাংশই আসতে চলেছে তাদের এই ইভি ব্যবসা থেকে।
শুধু বাস তৈরিতেই সীমাবদ্ধ নয়, জেবিএম সম্পূর্ণ একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত ইভি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। কোম্পানিটি ব্যাটারি সিস্টেম, আধুনিক ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল ফ্লিট সলিউশন এবং ইভি চার্জিং পরিকাঠামোর মতো বহুমুখী ক্ষেত্রে সমান দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে চলেছে। তাদের মূল বৈদ্যুতিক বাস উৎপাদন ব্যবসাটি ‘জেবিএম ইলেকট্রিক ভেহিকলস’-এর আওতাধীন পরিচালিত হয়, যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় কুড়ি হাজার বাস। এর পাশাপাশি, ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের কাজ পরিচালিত হয় ‘জেবিএম গ্রিন এনার্জি’র মাধ্যমে, যেখানে বার্ষিক ব্যাটারি উৎপাদন ক্ষমতা বর্তমানে ৬ গিগাওয়াট-আওয়ারে উন্নীত হয়েছে। এই উন্নত ব্যাটারিগুলো শুধুমাত্র বাস নয়, বরং বৈদ্যুতিক দুই ও তিন-চাকায়, এলসিভি এবং বিভিন্ন শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থায় সফলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও জেবিএম অটো তাদের ব্যবসার পরিধি দ্রুত প্রসারিত করছে। ভারত ছাড়াও ইউরোপ, উপসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকা, সিঙ্গাপুর এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন উদীয়মান বাজারে তারা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ইউরোপের বাজারে নিজেদের উপস্থিতি পাকাপোক্ত করতে ফ্রাঙ্কফুর্টে একটি সুনির্দিষ্ট সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়েছে এবং স্থানীয় মানদণ্ড মেনে বাম-হাতের স্টিয়ারিংযুক্ত বিশেষ বৈদ্যুতিক বাস তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া ব্যাটারি অ্যানালিটিক্স এবং ফ্লিট ম্যানেজমেন্টের মতো আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের জন্য তারা হিটাচি জিরোকার্বনের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাসগুলির কার্যকারিতা বাড়াতে এবং সঠিক সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে দারুণভাবে সাহায্য করবে।