মন্দার বাজারেও ভারতের ওপর ভরসা বহাল! বিশ্বজুড়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেও কীভাবে রেকর্ড গড়ছে বিদেশি তহবিল?

পশ্চিম এশিয়ায় চলমান তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে মুম্বাই-ভিত্তিক ব্রোকার এবং প্রাইভেট ইক্যুইটি (PE) ফান্ডগুলির সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এক বিরাট পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বখ্যাত পরামর্শদাতা সংস্থা ডেলয়েট এবং আইভিসিএ-বেইনের যৌথ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন ‘ইন্ডিয়া প্রাইভেট ইক্যুইটি রিপোর্ট ২০২৬’-এর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অস্থিরতা সত্ত্বেও ভারতে বিদেশি বিনিয়োগের বহুলপ্রতীক্ষিত প্রবাহ পুরোপুরি থেমে না গেলেও বিনিয়োগকারীদের মূল ভাবনায় এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। যেখানে এতদিন ফান্ড ম্যানেজারদের প্রধান লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র উচ্চ মুনাফা অর্জন, সেখানে বর্তমান অনিশ্চিত বাজারে তাদের মূল মনোযোগ এখন সম্পূর্ণরূপে ‘আর-ফ্যাক্টর’ অর্থাৎ ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতার দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, আইভিসিএ-বেইন রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সাল নাগাদ মোট পিই-ভিসি (PE-VC) বিনিয়োগ প্রায় ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে এসে ঠেকেছে। তবে ডেলয়েট ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, চুক্তির সংখ্যা সামগ্রিকভাবে হ্রাস পেলেও মূলধনের প্রবাহ অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বড় এবং উচ্চ-আস্থামূলক ডিলগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এশিয়া-প্যাচফিক অঞ্চলের সামগ্রিক মন্দা ও পতন সত্ত্বেও এই অঞ্চলের মোট প্রাইভেট ইক্যুইটি বিনিয়োগের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ একা ভারতের একক দখলেই রয়েছে, যা বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি শক্তির বড় প্রমাণ।
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, মার্কিন শুল্ক সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলের বড় ধরনের ব্যাঘাত মোকাবেলার জন্য বিনিয়োগকারীরা চুক্তি স্বাক্ষরের শর্তাবলীতে আমূল পরিবর্তন এনেছেন। আগে যেখানে চুক্তিপত্রে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি কেবল একটি সাধারণ লাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, এখন চুক্তি স্মারকলিপিতে এর জন্য একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও বিস্তারিত বিভাগ উৎসর্গ করা হচ্ছে। পুরানো দিনের সরল মূল্যায়ন ছাড়ের পদ্ধতি থেকে সরে এসে বর্তমান বাজার কাঠামোগুলিতে আর্ন-আউট, ডেফার্ড পেমেন্ট এবং শক্তিশালী ম্যাক ক্লজের ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি, দ্রুত প্রস্থান বা এক্সিটের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদী মূল্য সৃষ্টি এবং পরিচালনগত রূপান্তরের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে।
কোন খাতগুলো বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বিদেশি অর্থ আকর্ষণ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং সরকারের আকর্ষণীয় পিএলআই (PLI) স্কিমগুলোর কল্যাণে দেশীয় খাতগুলো যেমন—উৎপাদন, শিল্প, ভোগ্যপণ্য, খুচরা বাজার এবং আর্থিক পরিষেবা খাত সর্বাধিক বিদেশি তহবিল নিজেদের দিকে টেনে নিচ্ছে। একই সঙ্গে মার্কিন শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও রপ্তানিমুখী প্রতিরক্ষামূলক খাতগুলো—যেমন ফার্মাসিউটিক্যালস, সিডিএমও (CDMO), অটো যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম—পিই ফান্ডগুলোর কাছে দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তবে এর বিপরীতে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল আইটি বা আইটিইএস (IT/ITeS) এবং স্বল্প-মুনাফার আন্তঃসীমান্ত সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবসাগুলিতে বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
সবশেষে বলা যায়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মাঝেও বিশ্বের বৃহত্তম প্রাইভেট ইক্যুইটি সংস্থাগুলো ভারতের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, খ্যাতনামা কেকেআর (KKR) আগামী এক দশকে ভারতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, টেমাসেক (Temasek) ইতোমধ্যে ভারতে তাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে এবং তা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রাখছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে ভারতে পুঁজির কোনো ঘাটতি নেই, তবে ২০২৬ সালে পিই ফান্ডগুলির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে কেবল দ্রুত বর্ধনশীল কোম্পানি খুঁজে বের করা নয়, বরং এমন প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়া যা যেকোনো বৈশ্বিক ধাক্কা সহজেই সামলে নিতে পারে।