রাতে দই খেলেই কি বিপদ ডেকে আনছেন? আয়ুর্বেদ বনাম আধুনিক বিজ্ঞানের আসল সত্যটা কী জানেন?

টক দই আমাদের শরীরের জন্য কতটা উপকারী, সে কথা কমবেশি সকলেরই জানা। কিন্তু রাতের খাবারে পাতে এক বাটি দই পড়লেই বাড়ির বয়স্করা সাধারণত বারণ করে ওঠেন। মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, দিনের বেলায় যে খাবার শরীরের জন্য অমৃততুল্য, সূর্য ডুবলেই তা কেন হঠাৎ ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে? আসলে এই নিষেধাজ্ঞার শিকড় লুকিয়ে রয়েছে আয়ুর্বেদের বহু প্রাচীন এক সংস্কৃত শ্লোকে—‘নক্তং দধি ন ভুঞ্জীত’, যার সহজ অর্থ হলো রাতে কখনোই দই খাওয়া উচিত নয়। কিন্তু পুরনো দিনের এই নিয়মের পেছনে আসল রহস্যটা কী এবং আজকের আধুনিক বিজ্ঞানই বা এ বিষয়ে কী যুক্তি দিচ্ছে, তা নিয়ে রয়েছে বিস্তর আলোচনা।

প্রাচীন আয়ুর্বেদের অন্যতম প্রধান গ্রন্থ ‘চরক সংহিতা’-তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে রাতে দই খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত নয়। দই মূলত একটি ভারী খাবার এবং এটি শরীরে কফের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি করে। সূর্যাস্তের পর আমাদের হজম শক্তি স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়ে। ফলে এই সময় ভারী দই খেলে পেটের গোলমাল হওয়া এবং শরীরে কফ জমে সর্দি-কাশির প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, আধুনিক পুষ্টিবিদরা একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তাঁদের মতে, দইয়ে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে। তাই ঘড়ির কাঁটা রাত ছুঁলেই দই বিষাক্ত হয়ে যায়, এমন ধারণার কোনো জোরালো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মূল সমস্যাটি লুকিয়ে রয়েছে খাওয়ার সময়ের ওপর। দই সম্পূর্ণ হজম হতে কিছুটা সময় নেয়, তাই রাতের খাবার খেয়েই সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় চলে গেলে বদহজম, অম্বল বা বুক জ্বালার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের পেট ফাঁপার আশঙ্কা প্রবল থাকে।

তবে চরক সংহিতাতেই এর একটি কার্যকর সমাধান বাতলে দেওয়া হয়েছে। রাতে যদি একান্তই দই খাওয়ার ইচ্ছে হয়, তবে সাধারণ সাদা দই না খেয়ে তার সঙ্গে কিছু ঘরোয়া উপাদান মিশিয়ে নেওয়া ভালো। যেমন—সামান্য খাঁটি মধু, অল্প ঘি, এক চিমটে গোলমরিচ গুঁড়ো, বিট নুন, ভাজা জিরে গুঁড়ো কিংবা পাতলা মুগ ডালের জল মিশিয়ে খেলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। তবে যাঁদের রাতে খাওয়ার পর নিয়মিত বুক জ্বালা করে, ঠান্ডা লাগলে চট করে গলা বসে যায়, সাইনাস বা অ্যাজমার সমস্যা রয়েছে এবং যাঁদের হজমশক্তি দুর্বল, তাঁদের রাতে দই খাওয়া থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। সব মিলিয়ে নিজের শরীরকে বুঝে চলাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। রাতে দই খেয়ে যদি কোনো শারীরিক অস্বস্তি না হয়, তবে তা পরিমিত পরিমাণে খেতেই পারেন, তবে তা ঘুমানোর অন্তত দুঘণ্টা আগে সেরে ফেলা উচিত।