নবান্ন থেকে কলকাতা পুলিশ—সব জায়গায় কালনার রাখি! বড় সরকারি অর্ডারে ঘুচল শিল্পীদের দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্দশা

রাজ্য সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতর ও বিভিন্ন স্বনামধন্য সংস্থার কাছ থেকে বিশাল পরিমাণ রাখির বরাত পেয়ে নতুন করে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন পূর্ব বর্ধমানের কালনার ঐতিহ্যবাহী রাখি শিল্পীরা। আসন্ন উৎসবের মরশুমকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গ ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের পক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষেরও বেশি রাখি তৈরির সুনির্দিষ্ট অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি, কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকেও ৫০ হাজার রাখির বরাত এসে পৌঁছেছে স্থানীয় শিল্পীদের কাছে। শুধু তাই নয়, বিশেষ মর্যাদা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের জন্য পরিবেশবান্ধব উপাদানে তৈরি ১০ হাজার অভিনব রাখি বানানোর গুরুদায়িত্বও দেওয়া হয়েছে কালনার এই দক্ষ কারিগরদের। একসঙ্গে এত বড় এবং সুসংগঠিত সরকারি বরাত পাওয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় স্তরে কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং বিপুল আয়-রোজগারের সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্থানীয় রাখি উৎপাদন ও বিপণন সোসাইটির সম্পাদক তপন মোদক আনন্দের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই ধরনের সরকারি বরাত পাওয়ার জন্য সারা বছর ধরে মুখিয়ে থাকেন এখানকার কারিগররা। কারণ সাধারণ বাজারের তুলনায় সরকারি অর্ডারে কাজের পারিশ্রমিক অনেকটাই বেশি পাওয়া যায়। শিল্পীদের একাংশের দাবি অনুযায়ী, সরকারি বরাতে রাখি তৈরির ক্ষেত্রে মজুরি সাধারণ বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেশি মিলছে। ফলস্বরূপ, এই সরকারি উদ্যোগ কেবল তাঁদের বাড়তি কাজের সুযোগই করে দেয়নি, বরং সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের পরিবারের বার্ষিক আর্থিক সচ্ছলতায় অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এদিকে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ রাখি তৈরির কাজ সফলভাবে শেষ করতে এখন কার্যত দিন-রাত এক করে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন কালনার রাখি শিল্পীরা। উৎসবের মরশুমের চাপে তাঁদের প্রতিদিন প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত টানা কাজ করতে হচ্ছে। তবে মোটা অংকের পারিশ্রমিক এবং সুনিশ্চিত বড় বরাত পাওয়ার কারণে এই হাড়ভাখা পরিশ্রমের মধ্যেও কারিগরদের মনে কাজ করছে প্রবল উৎসাহ। স্থানীয় শিল্পী তনুশ্রী মজুমদার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, কাজের প্রচণ্ড ব্যস্ততা ও দীর্ঘ সময় কাজ করতে হলেও বেশি মজুরি পাওয়ার আনন্দ তাঁদের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিচ্ছে।

কালনার রাখি শিল্পের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে যুক্ত বহু পিছিয়ে পড়া পরিবারের কাছে রাজ্য সরকারের এই বিশাল উদ্যোগ এক মস্ত বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। একদিকে বিশাল সংখ্যক রাখি তৈরির কর্মযজ্ঞ, অন্যদিকে তুলনামূলক অনেক বেশি পারিশ্রমিক—এই দুইয়ের মিলনে সামগ্রিক পরিবেশ এখন অত্যন্ত উৎসবমুখর। স্থানীয় শিল্পীদের জোরদার আশা, আগামী দিনেও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতর, পুলিশ প্রশাসন এবং অন্যান্য বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে এমন নিয়মিত ও বড় বরাত মিললে কালনার এই প্রাচীন লোকশিল্প আরও বেশি বিস্তৃত হবে। এর হাত ধরেই এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত শত শত পরিবারের জীবিকাতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্বস্তি ফিরে আসবে বলে তাঁরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।