অপশন বাইয়িংয়ে কোটি কোটি টাকা খোয়াচ্ছেন সাধারণ ট্রেডাররা! সেবির সমীক্ষায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

শেয়ার বাজারের ফিউচার ও অপশন্স বা এফ অ্যান্ড ও (F&O) সেগমেন্ট বর্তমানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এক কঠিন লড়ায়ে পরিণত হয়েছে। বাজারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং সম্প্রতি প্রকাশিত সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া বা সেবির (SEBI) একটি নতুন সমীক্ষা থেকে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ খুচরো লগ্নিকারী মূলত ‘অপশন বায়িং’ বা অপশন কেনার কৌশল বেছে নেন। অন্যদিকে, মাত্র ২ শতাংশ লগ্নিকারী ‘অপশন সেলিং’ বা অপশন বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসা করেন। আর এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ২ শতাংশ লগ্নিকারীই ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাঁদের মূলধনের বিপরীতে ইতিবাচক গড় রিটার্ন ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

সহজ কথায়, যাঁরা অপশন বিক্রি করেন, তাঁরাই মূলত লাভের মুখ দেখছেন। এর বিপরীতে, যাঁরা অপশন কেনেন, তাঁদের সিংহভাগই প্রতিদিন লোকসানের মুখে পড়ছেন। তা সত্ত্বেও বাজারে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ খুচরো লগ্নিকারী কেন অপশন কেনার দিকেই ঝুঁকছেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো অপশন কেনার ক্ষেত্রে প্রাথমিক খরচ বা প্রিমিয়ামের পরিমাণ কম থাকে এবং খাতায়-কলমে লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো।

বাজার বিশারদদের মতামত অনুযায়ী, অপশন বিক্রেতাদের নেপথ্যে সাধারণত বড় ব্রোকারেজ সংস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক লগ্নিকারী বা অভিজ্ঞ ট্রেডাররা থাকেন। এঁদের হাতে পর্যাপ্ত মূলধন, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের নিখুঁত কৌশল এবং কম্পিউটার-চালিত অ্যালগো ট্রেডিং সিস্টেমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি থাকে। এর ঠিক উল্টো ছবি দেখা যায় সাধারণ খুচরো লগ্নিকারীদের ক্ষেত্রে। তাঁরা প্রায়শই আবেগতাড়িত হয়ে, গুজবের ওপর ভরসা করে বা সোশ্যাল মিডিয়ার তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে অন্ধের মতো অপশন কেনেন। ফলে বাজারের হঠাৎ ওঠাপড়ার সঙ্গে তাঁরা তাল মেলাতে পারেন না এবং বারবার সর্বস্বান্ত হন।

সেবির এই রিপোর্টে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, যাকে বলা হয় ট্রেডিং ‘ইনটেনসিটি’। অর্থাৎ, মোট মূলধনের তুলনায় কতটা ঘন ঘন লেনদেন বা ট্রেডিং করা হচ্ছে, তার সঙ্গে লোকসানের সরাসরি যোগ রয়েছে। যত বেশি ঘন ঘন এবং বড় অঙ্কে লেনদেন করা হবে, ক্ষতির আশঙ্কা ততটাই বৃদ্ধি পাবে। এই প্রবণতাটি মূলত অপশন-ক্রেতা, তরুণ প্রজন্ম এবং স্বল্প পুঁজির লগ্নিকারীদের মাঝেই সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, ট্রেডিংয়ের অভিজ্ঞতা বাড়লেও লোকসানের হার কমছে না। সমীক্ষা জানাচ্ছে, ট্রেডিংয়ে যত বছরেরই অভিজ্ঞতা থাকুক না কেন, ক্ষতির অঙ্ক প্রায় একই থেকে যাচ্ছে। যাঁরা টানা দু’বছর ধরে লোকসান করেও বাজার ছাড়েননি, তাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশ তৃতীয় বছরে এসেও ভারী লোকসানের মুখে পড়েছেন। অর্থাৎ, বাজার থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করে ট্রেন্ড ‘শিখে যাওয়ার’ তত্ত্ব এখানে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, সামগ্রিকভাবে প্রায় ৮৫ শতাংশ ট্রেডার-কোয়ার্টার পর্যবেক্ষণই ছিল লোকসানমুখী, যেখানে লাভজনক ট্রেডিং হয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ। এমনকি যাঁরা মাঝেমধ্যে কিছু মুনাফা করেছেন, তাঁদের প্রায় ৭৯ শতাংশের ক্ষেত্রে লাভজনক কোয়ার্টারে গড় লাভের পরিমাণ লোকসানের কোয়ার্টারের গড় ক্ষতির তুলনায় অনেক কম।

সব মিলিয়ে শেয়ার বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পষ্ট। অপশন্স বাজারে টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি হলো পর্যাপ্ত মূলধন, বৈজ্ঞানিক কৌশল এবং উন্নত প্রযুক্তি। সাধারণ খুচরো লগ্নিকারীদের হাতে এই সমস্ত উপকরণের অভাব থাকায় তাঁদের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।