সাদা-কালো পর্দার সেই ‘হংসরাজ’ আজও বাঙালির নস্টালজিয়া! ৫০ বছর পূর্তিতে এল বড় চমক

কলকাতার বুকে হারিয়ে যাওয়া সিঙ্গল স্ক্রিন, প্রথম বাউলগানে মিউজিক্যাল হিট ছবির অজানা গল্প এবং নস্টালজিয়ায় মোড়া স্মৃতির রোমন্থন—সব মিলিয়ে আজ ঠিক অর্ধশতাব্দী পূর্ণ করল বাংলা সিনেমার এক সোনালী অধ্যায়। ১৯৭৬ সালের ২০ অগাস্ট সিলভার স্ক্রিনে মুক্তি পেয়েছিল অজিত গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত কালজয়ী বাংলা ছবি ‘হংসরাজ’ (Hangsharaj)। আর এই ছবির সুবর্ণজয়ন্তীর দিনেই অভিনেতা তথা সঙ্গীতশিল্পী অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে প্রকাশিত হতে চলেছে নতুন বই ‘সাদা কালো স্মৃতি’। শালিধান প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষ্যে কলকাতার প্রেস ক্লাবে বসেছে চাঁদের হাট।

ষাটের ও সত্তরের দশকে কলকাতার উত্তরা, পূরবী এবং উজ্জ্বলা সিনেমা হলে জাঁকজমকপূর্ণভাবে মুক্তি পেয়েছিল এই ছবি। আজ সেই তিনটে প্রেক্ষাগৃহই কালের নিয়মে অতীত, তাদের জায়গায় মাথা তুলেছে ঝাঁ চকচকে শপিং মল বা বহুতল। কিন্তু শহর বদলালেও দর্শকদের মন থেকে মুছে যায়নি ‘হংসরাজ’-এর পঙ্‌ক্তিমালা কিংবা এর জাদুকরী সুর। বিশেষ করে, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই ছবিই প্রথম বাউলগানের সুবাদে মিউজিক্যাল হিট তকমা অর্জন করেছিল।

অনেকেরই ধারণা, ‘হংসরাজ’ বুঝি অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিনয় জীবনের প্রথম ছবি। তবে তথ্য বলছে অন্য কথা। এটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের ১৬ নম্বর ছবি। এর আগে কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শিশুবেলার চরিত্রে ‘প্রস্তর সাক্ষর’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। পর্দার সেই ছোট্ট ‘হংসরাজ’ অর্থাৎ অরিন্দমের কাছে পরিচালক অজিত গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন ‘অজীত মামা’। কিন্তু অবাক করা তথ্য হলো, ছবির মূল চরিত্রের জন্য অরিন্দম প্রথম পছন্দ ছিলেন না।

ছবির নেপথ্যের এই কাস্টিং বিতর্ক নিয়ে আজও চর্চা কম হয় না। প্রথমে বনশ্রী সেনগুপ্ত ফোন করে সুধীন দাশগুপ্তের সঙ্গে দেখা করতে বলেন ছোটো অরিন্দমকে, কারণ তাঁর গলায় গান রেকর্ডের কথা ছিল। কিন্তু সেসময়ে এইচএমভির আপত্তির মুখে পড়ে ছবির গানগুলি গেয়েছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী আরতি মুখোপাধ্যায়। অরিন্দমের গান গাওয়া না হলেও পরিচালক তাঁকে ডেকে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। মায়ের উৎসাহেই রূপালী পর্দায় পথ চলা শুরু হয় তাঁর এবং এই ছবির মাধ্যমেই তাঁর নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় ‘হংসরাজ’ উপাধি।

আজকের এই বিশেষ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত রয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের বহু দিকপাল ব্যক্তিত্ব। অরিন্দম ও তাঁর স্ত্রী তথা অভিনেত্রী খেয়ালি দস্তিদার ছাড়াও এই সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের মেলবন্ধনের সাক্ষী থাকতে উপস্থিত থাকবেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তী, অলোকা গঙ্গোপাধ্যায়, স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত, শুভ দাশগুপ্ত এবং প্রফেসর ড. ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্টজনেরা।

‘হংসরাজ’ ছবিতে অরিন্দমের পাশাপাশি চুটিয়ে অভিনয় করেছিলেন স্বর্ণালী গাঙ্গুলি নাগ (টিয়া), বাসুদেব পাল (শামু), বিউটি মামণি মুখোপাধ্যায় (নূপুর), সুবীর ঘোষের (ডনি) মতো শিশুশিল্পীরা। পাশাপাশি ছিলেন সন্ধ্যারানি, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনতা রায়, জহর রায় এবং কামু মুখোপাধ্যায়ের মতো তাবড় অভিনয়শিল্পীরা। অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও এই ছবির আবেদন আজও ফুরোয়নি, যা প্রমাণ করে দিল নতুন এই বইটির প্রকাশ।