হোটেলের আড়ালে লুকিয়ে ‘গুপ্ত হোটেল’! দুর্গাপুরে দমকলের অভিযানে ফাঁস চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি ও মারাত্মক নিরাপত্তার ত্রুটি

তারাপীঠের মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ স্মৃতি এখনও রাজ্যবাসীর মনে তাজা। সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। রাজ্যজুড়ে সমস্ত হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক বৈধতা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে পুলিশ ও দমকল বিভাগ। এই বিশেষ নিরাপত্তা অভিযানের অংশ হিসেবেই বৃহস্পতিবার দুর্গাপুরের অন্যতম ঘিঞ্জি ও পুরনো এলাকা বেনাচিতি বাজারের একাধিক হোটেলে যৌথ তল্লাশি চালান দমকল ও পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা। আর সেই তল্লাশিতেই বেরিয়ে এল একের পর এক চোখ কপালে তোলার মতো ভয়াবহ তথ্য, যা নিরাপত্তার চাদরে মোড়া হোটেল ব্যবসার আসল চিত্রটাকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে।

বেনাচিতি বাজারের একসময়ের অনুরাধা সিনেমা হলের পাশের সরু গলির ভেতরে পাশাপাশি অবস্থিত হোটেলগুলিতে হানা দিয়ে আধিকারিকরা দেখতে পান এক বিপজ্জনক ছবি। অভিযোগ, বেশিরভাগ হোটেলেই যে সমস্ত অগ্নিনিরাপত্তা যন্ত্র বা সিলিন্ডার রাখা রয়েছে, সেগুলির দীর্ঘকাল আগেই মেয়াদ উত্তীর্ণ (Expired) হয়ে গিয়েছে। কোথাও আবার অগ্নিনির্বাপণ পরিকাঠামো নামমাত্র থাকলেও তা সম্পূর্ণ অকেজো ও বিকল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আগুন লাগার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত জল সরবরাহের জন্য যে ডেডিকেটেড পাম্প হাউস থাকার কথা, তার চারপাশ আগাছায় সম্পূর্ণ ঢেকে রয়েছে। জল সরবরাহের পাইপলাইনগুলির অবস্থাও এতটাই বেহাল যে, বিপদের মুহূর্তে তা এক ফোঁটা জলও জোগান দিতে পারবে না। অর্থাৎ, মানুষের জীবন রক্ষার যে প্রাথমিক ব্যবস্থা থাকার কথা, তা আক্ষরিক অর্থেই এক প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

তবে এই সমস্ত গাফিলতির পরেও দমকলের নজরে আসা সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর এবং রহস্যজনক বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। অভিযانের সময় একটি হোটেলের একেবারে পিছনের অংশে এমন একটি গোপন পরিকাঠামোর সন্ধান মেলে, যাকে তদন্তকারী আধিকারিকেরা কার্যত ‘গুপ্ত হোটেল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হোটেলের মূল দৃশ্যমান অংশের আড়ালে তৈরি এই অবৈধ অংশটি সম্পর্কে হোটেলের ম্যানেজার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। ফলে জনাকীর্ণ ওই এলাকায় সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে অতিথিদের গাদাগাদি করে কোথায় রাখা হতো এবং তার আইনি বৈধতা কী ছিল, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিযানের সময় হোটেলের কর্মচারীরাও চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। এক বেসরকারি হোটেলের ম্যানেজার দাবি করেন যে তিনি মাত্র আট মাস ধরে সেখানে কাজ করছেন এবং এই বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণাই নেই। অন্যদিকে, লিজ নেওয়া ওই হোটেলের দায়িত্বে থাকা দেবজ্যোতি দেব সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দাবি করেছেন যে তাদের হোটেলের সমস্ত নথি এবং কাগজপত্র সম্পূর্ণ বৈধ নিয়মেই পরিচালিত হচ্ছে। যদিও এই সাফাই মানতে নারাজ প্রশাসন। দুর্গাপুরের এসিপি সুবীর রায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে কেবল মৌখিক দাবি করলেই চলবে না; হোটেলের ফায়ার সেফটি, আইনি বৈধতা এবং অতিথিদের নিরাপত্তার সমস্ত নথিপত্র কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। যারা এই নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করবে কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বেনাচিতির এই ঘটনায় ফের একবার প্রমাণিত হলো যে, সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে বিলাসবহুল ঘরের চাকচিক্যের নিচে কীভাবে মৃত্যুর ফাঁদ পেতে বসে রয়েছে একাধিক হোটেল।