সস্তা থাইল্যান্ড ট্যুরের লোভেই সর্বনাশ! ব্যাংককে গিয়ে ৭ দিনের বিভীষিকায় বন্দি ৩ ভারতীয়!

থাইল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় পর্যটকদের কাছে একটি অত্যন্ত প্রিয় এবং জনপ্রিয় বিদেশী গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিক সেখানে ছুটি কাটাতে, ঘুরতে এবং নতুন সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা অর্জন করতে ছুটে যান। এই দর্শনার্থীরা যথাসম্ভব সাশ্রয়ী ও সস্তা ট্যুর প্যাকেজ বেছে নিয়ে নিজেদের ভ্রমণের আনন্দকে দ্বিগুণ করার চেষ্টা করেন। তবে সাম্প্রতিককালে, এই অতিরিক্ত সস্তা প্যাকেজের প্রলোভনে পা দেওয়া ব্যক্তিরাই সবথেকে বেশি প্রতারিত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক এবং চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই ভয়াবহ অপরাধকাণ্ডে জড়িত গ্যাংয়ের মূল পাণ্ডারাও অন্য কেউ নয়, বরং ভারতীয় নাগরিকরাই।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকক এবং পাতায়াকে কেন্দ্র করে প্রতারণা, অপহরণ এবং মানব পাচারের বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা সামনে এসেছে, যা সেখানে আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই ঘটনাগুলো বিদেশে ভ্রমণকারী প্রতিটি পর্যটকের জন্য চরম সতর্কবার্তা বয়ে এনেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২১শে জুলাই তিনজন ভারতীয় পর্যটক ব্যাংককে এসে পৌঁছান। তাঁদের অভিযোগ, অত্যন্ত লোভনীয় ও সস্তা একটি ট্যুর প্যাকেজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের থাইল্যান্ডে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যার ফলে তাঁরা সেখানে পৌঁছানোর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফাঁদে আটকে পড়েন। থাইল্যান্ডে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই ওই পর্যটকদের ব্যাংকক থেকে সোজা পাতায়ায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং একটি গোপন ভাড়াবাড়িতে বন্দুকের মুখে জিম্মি করে আটকে রাখা হয়।
সিএনবিসিটিভি১৮-এর একটি বিশ্বস্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, উদ্ধার হওয়ার আগে পর্যন্ত ভুক্তভোগী ওই তিন ভারতীয় পর্যটকদের ওপর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। তাঁদের ওপর লাগাতার শারীরিক মারধর করা হয় এবং অভুক্ত রাখা হয়। এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তাঁদের পরিবারের কাছে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা বিশাল অংকের মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। অবশেষে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর গত ২৭শে জুলাই থাই পুলিশ সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ওই গোপন আস্তানায় অতর্কিত অভিযান চালায় এবং তিন ভারতীয় পর্যটককে সম্পূর্ণ নিরাপদে উদ্ধার করে। এই মামলার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিকটি হলো, যে সমস্ত সন্দেহভাজনরা তাঁদের এই মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে থাইল্যান্ডে ডেকে এনেছিল এবং বন্দি বানিয়েছিল, তারা প্রত্যেকেই ভারতীয় নাগরিক।
উল্লেখ্য, এই ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম নয় এবং এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। এর আগেও এমন বহু মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে যেখানে বিদেশে লোভনীয় চাকরি, আকাশছোঁয়া বেতন বা অস্বাভাবিক সস্তা ট্যুর প্যাকেজের ফাঁদে ফেলে ভারতীয়দের থাইল্যান্ডে ডেকে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে বহু মানুষকে জোরপূর্বক মিয়ানমারের কুখ্যাত সাইবার জালিয়াতি কেন্দ্রে পাচার করা হয়েছে, যেখানে তারা সাইবার অপরাধ চক্রের শিকারে পরিণত হন। এছাড়াও, কিছু অসহায় ভারতীয় নারী অভিযোগ করেছেন যে চাকরির ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার পর জোর করে পতিতাবৃত্তির মতো অসামাজিক কাজে নামতে বাধ্য করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ পর্যটকদের প্রকাশ্যেই অপহরণ করে তাঁদের পরিবার বা আত্মীয়দের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায়ের নজিরও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সমস্ত ভ্রমণপিপাসু নাগরিকদের উদ্দেশ্যে জোরালো পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যে, কোনো ধরনের পূর্ব যাচাই বা সঠিক জ্ঞান ছাড়া যেন কোনো সোশ্যাল মিডিয়া বা অপরিচিত মাধ্যমের অতিরিক্ত আকর্ষণীয় ও সস্তা ট্যুর প্যাকেজ কিংবা ভিনদেশের চাকরির অফারে ভুলেও বিশ্বাস করা না হয়। যেকোনো ট্র্যাভেল এজেন্সি বা কোম্পানির লাইসেন্স ও বিশ্বাসযোগ্যতা আগে থেকেই ভালো করে যাচাই করে নেওয়া উচিত। বিদেশ ভ্রমণের সময় সর্বদা নিজের পরিবারের সদস্যদের সাথে সমস্ত লাইভ লোকেশন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করা এবং পাসপোর্টের মতো সমস্ত জরুরি নথি অত্যন্ত নিরাপদে নিজের কাছে রাখা বাধ্যতামূলক। কোনো কারণে কোনো অনভিপ্রেত বা জরুরি পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে অবিলম্বে স্থানীয় থাই পুলিশ প্রশাসন এবং ভারতীয় দূতাবাসের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।