বিক্ষোভে অপরাধীদের কোনো ছাড় নেই! সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের সাফ বার্তায় কোন গোপন রহস্য ফাঁস?

দেশজুড়ে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর নিট প্রশ্নফাঁস বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা এবং বিক্ষোভের জেরে দায়ের হওয়া আইনি মামলাগুলি নিয়ে সোমবার দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী শুনানির পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে এদিনের এই গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের কাছে নিজেদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করে জানানো হয়েছে যে, নিট প্রশ্নফাঁসের মতো সংবেদনশীল অভিযোগে আন্দোলন ও প্রতিবাদে অংশ নেওয়া কোনো সাধারণ ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকার বা প্রশাসন কোনো ধরনের কঠোর ফৌজদারি পদক্ষেপ করতে চায় না। তবে একই সঙ্গে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে যে, এই গণআন্দোলনের আড়ালে লুকিয়ে থেকে যারা সুপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন গুরুতর অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের দেশের প্রচলিত আইনের হাত থেকে কোনো অবস্থাতেই কোনো রকম রেহাই বা ছাড় দেওয়া হবে না।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত-র নেতৃত্বাধীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলাকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে উপস্থিত প্রবীণ সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতের সামনে স্পষ্ট করে জানান যে, সাধারণ আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে অতীতে দায়ের হওয়া বিভিন্ন এফআইআর বা প্রাথমিক তথ্য বিবরণী প্রত্যাহার কিংবা তার যথাযথ নিষ্পত্তির সামগ্রিক বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে মূল আবেদনকারীদের সঙ্গে অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ খুব শীঘ্রই গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে তিনি পুনরায় আদালতের নজর আকর্ষণ করে জোরালোভাবে বলেন যে, বিক্ষোভের পবিত্র পরিবেশকে নষ্ট করে যারা হিংসাত্মক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিল, সেই সমস্ত চিহ্নিত অপরাধীদের ক্ষেত্রে কোনো নমনীয়তা দেখানো হবে না।
অন্যদিকে, শুনানিমঞ্চে আবেদনকারীদের পক্ষে উপস্থিত বিশিষ্ট আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভার আদালতের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন যে, প্রতিটি আলাদা মামলার ক্ষেত্রে সরকারি কৌঁসুলিকে যদি আলাদাভাবে ক্লোজার রিপোর্ট জমা দিতে হয়, তবে গোটা আইনি প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে তিনি পাটনার একটি নির্দিষ্ট এফআইআরের উদাহরণ টেনে জানান যে, সেখানে প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি অজ্ঞাতপরিচয় সাধারণ বিক্ষোভকারীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট এফআইআরগুলি সরাসরি বাতিল করা হবে, নাকি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় প্রত্যাহার করা হবে—সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা জারির জন্য আদালতের কাছে বিশেষ আর্জি জানানো হয়।
উভয় পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর বিচারপতির বেঞ্চ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে জানায় যে, যেকোনো বিস্তারিত তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই প্রকৃত ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া রাজনৈতিক বা সাধারণ মামলা এবং অন্যদিকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্তদের মামলা সম্পূর্ণ আলাদাভাবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে আদালত খুব পরিষ্কার ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছে যে, ‘ক্রিমিনাল হিস্ট্রি’ বা অপরাধের ইতিহাস বলতে মূলত খুন, জখম বা অন্যান্য হাড়হিম করা গুরুতর অপরাধের মতো অভিযোগগুলোকেই বোঝানো হবে। সাধারণ কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শান্তিপূর্ণভাবে অংশ নেওয়া কিংবা ছোটখাটো কোনো তুচ্ছ মামলাকে কখনোই সেই গুরুতর অপরাধের তালিকায় ফেলা যাবে না।
এছাড়াও, আন্দোলন চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা পুলিশি বাড়াবাড়ির যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে এদিন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষ আদালত। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো, আইনের রক্ষক হয়েও যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, সেই সমস্ত অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের কোনোভাবেই বিনা বিচারে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে—এমন কোনো ধারণার অবকাশ নেই। এই পুলিশি বাড়াবাড়ির নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হবে, নাকি সুপ্রিম কোর্টেরই কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির সরাসরি তত্ত্বাবধানে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন কমিটি তৈরি করা হবে, তা নিয়েও আদালত এই মুহূর্তে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করছে।
শুনানিকালে এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আরেকটি অত্যন্ত গুরুতর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়। সেখানে মুখের ছবি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি বা ফেসিয়াল রিকগনিশন টেকনোলজি ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ওপর বেআইনিভাবে নজরদারি চালানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে। আবেদনকারীদের মূল দাবি ছিল যে, সাধারণ মানুষের কোনো ধরনের পূর্বানুমতি বা সম্মতি ছাড়াই বিপুল সংখ্যক মানুষের মুখের সংবেদনশীল তথ্য গোপনে সংগ্রহ করা হয়েছে, যা সরাসরি দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের পরিপন্থী। এর জবাবে কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয় যে, কেবল ওই বিশেষ প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হয়নি, বরং মাঠপর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাইয়ের কাজও সম্পন্ন করা হয়েছে। সবমিলিয়ে মোট ২,৭৩৮ জনের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই একাধিক গুরুতর অপরাধের মামলা নথিভুক্ত রয়েছে।
শুনানির একেবারে শেষ পর্যায়ে দেশের শীর্ষ আদালত পুনরায় অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দেয় যে, দেশের মেধাবী ও প্রকৃত ছাত্রছাত্রীদের কোনো অবস্থাতেই যেন অযথা আইনি হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেদিকে প্রশাসনকে কড়া নজর রাখতে হবে। তবে শুধুমাত্র ছাত্র আন্দোলনের মতো একটি অজুহাতকে সামনে রেখে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি যাতে কোনোভাবেই আইনি সুরক্ষার সুবিধা দাবি করতে না পারে, তাও নিশ্চিত করা হবে। আগামী ১৮ অগাস্ট এই মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শুনানি নির্ধারিত হয়েছে। তার আগে আদালতের পক্ষ থেকে এই মামলার সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজেদের বিশদ হলফনামা বা অ্যাফিডেভিট জমা দেওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।