ওবেরয় হোটেলের প্রেম থেকে আইনি লড়াই! দীর্ঘ ৩২ বছরের সম্পর্কের পর অবশেষে বিচ্ছেদের সিলমোহর সুপ্রিম কোর্টের

কয়েক দশক আগে দিল্লির এক বিলাসবহুল হোটেলের ঝলমলে পরিবেশের মাঝে দুটি তরুণ প্রাণের সাক্ষাৎ ঘটেছিল। মিষ্টি হাসিমুখ দিয়ে শুরু হওয়া সেই কথোপকথন ধীরে ধীরে গভীর বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হয়, যা পরবর্তীকালে ভালোবাসার রূপ নেয় এবং সমস্ত সামাজিক ও ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে দুজনে একসঙ্গে জীবন কাটানোর শপথ নেন। তবে বাস্তবের কঠিন জমিতে প্রতিটি প্রেমের পরিণতি সুখের হয় না। প্রায় তিন দশক আগে শুরু হওয়া জম্মু ও কাশ্মীরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এবং পায়েল আবদুল্লাহ (যিনি পূর্বে পায়েল নাথ নামে পরিচিত ছিলেন)-র এই হাই-প্রোফাইল প্রেমের গল্পের শেষ অধ্যায়টি অবশেষে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে এসে লিখিত হলো। সুপ্রিম কোর্ট উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন মঞ্জুর করে তাদের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের সম্পর্ককে আইনগতভাবে সমাপ্ত করার পথ প্রশস্ত করেছে।
জানা যায়, ওমর আবদুল্লাহ ও পায়েল নাথের প্রথম পরিচয় হয়েছিল দিল্লির অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ওবেরয় হোটেলে। সেই সময় ওমর ওই হোটেল গোষ্ঠীতে একজন বিপণন আধিকারিক বা মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং পায়েলও সেই একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একসঙ্গে কাজ করতে করতেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায় এবং তা পরিণয়ে গড়ায়। একদিকে পায়েল ছিলেন ভারতীয় সেনার অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল রামনাথের কন্যা, আর অন্যদিকে ওমর ছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বর্ষীয়ান নেতা ফারুক আবদুল্লাহর পুত্র। পারিবারিক ও ধর্মীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও তারা সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে ১৯৯৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তাদের সংসারে দুই পুত্রসন্তান—জহির ও জমিরের জন্ম হয়। বাহ্যিকভাবে এই পরিবারটি একটি আদর্শ পরিবারের ছবি ফুটিয়ে তুললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পর্কে চিড় ধরতে শুরু করে। পরবর্তীকালে ওমর আবদুল্লাহ আদালতে দাবি করেছিলেন যে ২০০৭ সালের পর থেকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের মধ্যে কোনো বৈवाहिक সম্পর্ক বজায় ছিল না এবং ২০০৯ সাল থেকে তারা সম্পূর্ণ আলাদা থাকছিলেন। তার দাবি ছিল, এই বন্ধন সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছে এবং পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে তাকে মানসিক কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
অবশ্য এই আইনি লড়াইয়ের পথটি মোটেও সহজ ছিল না। ক্রূরতা বা নিষ্ঠুরতার অভিযোগে ওমর আবদুল্লাহ প্রথমে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করলেও ২০১৬ সালে পারিবারিক আদালত তা খারিজ করে দেয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে দিল্লি হাইকোর্টও নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে জানায় যে ওমর তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ক্রূরতার অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেননি। এরপর বিষয়টি গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শীর্ষ আদালত এই মামলায় নোটিশ জারি করে। তবে দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং টানাপোড়েনের পর উভয় পক্ষই আদালতের বাইরে পারস্পরিক মধ্যপস্থার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানિકালে প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল বিচারপতি পি এস নরসিমা এবং বিচারপতি অলোক আরাধের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চকে জানান যে দুই পক্ষই সমস্ত বৈল্পিক বিরোধ মিটিয়ে ফেলেছে এবং সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিবাহ বিচ্ছেদের যৌথ আবেদন দাখিল করেছে। সিব্বল আদালতকে অনুরোধ করেন, “দুজনই এখন মুক্তি চান এবং সমস্ত বিবাদ মিটে গেছে, তাই দয়া করে বিচ্ছেদ মঞ্জুর করুন।” তিনি জানান যে সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বিচারাধীন সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করে নেবে।