পাথর সাম্রাজ্যে বড় ধাক্কা! টুলু মণ্ডলের আরও ৪২.৫ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ পুলিশের

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বিতর্কিত পাথর মাফিয়া তথা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল ওরফে মহম্মদ নিজামউদ্দিনের বিরুদ্ধে চলা আর্থিক দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পত্তি অর্জনের তদন্তে এক বিরাট ও চাঞ্চল্যকর সাফল্য পেল পুলিশ। শনিবার তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে আরও সাড়ে বিয়াল্লিশ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণরূপে ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। এই নতুন পদক্ষেপের ফলে এখনও পর্যন্ত এই মামলায় মোট ১৩৫.৫ কোটি টাকা (প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা) বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে জব্দ করা হলো। এর আগে একাধিক তল্লাশি অভিযানে উদ্ধার হওয়া নগদ প্রায় ৫০.৫ কোটি টাকা এবং বিপুল পরিমাণ সোনার গয়না সহ এখনও পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে প্রায় ১৮৬ কোটি টাকার সম্পত্তি ও নগদ অর্থ বাজেয়াপ্ত কিংবা ফ্রিজ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পুলিশি তদন্তে টুলু মণ্ডলের নামে একাধিক বিপুল ও অস্বাভাবিক সম্পত্তির সন্ধান মিলেছে। ইতিমধ্যেই তাঁর মালিকানাধীন ২৪২টি বিভিন্ন ধরনের ভারী যানবাহন, দুটি লাভজনক পেট্রোল পাম্প এবং ২১টি উচ্চমূল্যের স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এই বিশাল সম্পত্তির দীর্ঘ তালিকার মধ্যে রয়েছে অন্তত সাতটি সুদৃশ্য বাড়ি, বিলাসবহুল একটি ফার্মহাউজ সহ একাধিক বহুমূল্য রিয়েল এস্টেট প্রপার্টি।

তদন্তের জালে একে একে ফাঁসছে অপরাধের জাল। এদিকে, টুলু মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মিনার মণ্ডলের বিলাসবহুল বাড়ি থেকে ৫০ কোটিরও বেশি টাকার অবৈধ সম্পদ উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। যার মধ্যে প্রায় ২২ কোটি টাকার খাঁটি সোনা এবং ২৮.৫ কোটি টাকা নগদ ক্যাশ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। এই ঘটনার জেরে মূল অভিযুক্ত টুলু মণ্ডল ওরফে মহম্মদ নিজামউদ্দিনের বিরুদ্ধে আদালত থেকে একটি কড়া জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা বা নন-বেলেবল ওয়ারেন্ট (NBW) জারি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য তদন্তকারী সংস্থার বিশেষ আবেদনের ভিত্তিতেই আদালত এই নির্দেশিকা জারি করেছে। ইতিমধ্যে এই আর্থিক তছরুপের মামলায় অভিযুক্ত মিনার মণ্ডলকে পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর একাধিক কঠোর ধারায় সুনির্দিষ্ট মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে যে, মিনার মণ্ডলের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের রচনা, সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কার্যকলাপে সরাসরি যুক্ত থাকার মতো মারাত্মক অভিযোগ আনা হয়েছে। গোটা ঘটনার নেপথ্যে থাকা অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাগাল পেতে এবং অপরাধের সিন্ডিকেট ভাঙতে পুলিশের পক্ষ থেকে তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ এখনও জোরকদমে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এদিকে বীরভূমের এই ‘পাথর-সম্রাট’ টুলু মণ্ডল ঠিক কোথায় লুকিয়ে রয়েছেন, তা নিয়ে এখন রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক জল্পনা ও চাঞ্চল্য। তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মিনার মণ্ডল পুলিশি জালে ধরা পড়লেও মূল পান্ডা টুলু মণ্ডল এখনও অধরা। তদন্তকারী গোয়েন্দাদের তীব্র আশঙ্কা যে, তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে দুবাই হয়ে সরাসরি তুরস্কে পালিয়ে গিয়ে গা ঢাকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত সপ্তাহেই নিজের পুরো পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে অত্যন্ত গোপনে দুবাই উড়ে গিয়েছিলেন নাজিবুদ্দিন মণ্ডল ওরফে টুলু মণ্ডল। তাঁর সেই যাত্রাপথে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বারিক বিশ্বাসের পরিবারও সফরসঙ্গী ছিল বলে জানা যাচ্ছে। গোয়েন্দাদের জোরালো অনুমান, মধ্যপ্রাচ্যের সেই রুট ব্যবহার করে পরে তুরস্ক কিংবা অন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে পাড়ি দিতে পারেন এই পলাতক অভিযুক্ত। পুলিশ সূত্রে আরও নিশ্চিত করা হয়েছে যে, বর্তমানে টুলু মণ্ডলের ব্যবহার করা চারটি মোবাইল ফোনই নাগাড়ে সুইচড অফ রয়েছে, যা তাঁর নিখোঁজ থাকার রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।