যন্তর মন্তরের সেই বিতর্কিত ঘটনায় বড় মোড়! হাত জোড় করে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইল অভিযুক্ত নাবালিকা

দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র আন্দোলন চলাকালীন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর প্রয়াত মাতাকে লক্ষ্য করে অশালীন ও চরম আপত্তিকর ভাষায় স্লোগান দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে দেশজুড়ে যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে এবার এক চাঞ্চল্যকর নতুন মোড় এল। সেই বিতর্কিত ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি নতুন ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে সটান হাতজোড় করে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে এক অভিযুক্ত কিশোরী। নিজেকে মাত্র ১৫ বছর বয়সি নাবালিকা বলে দাবি করে সে জানিয়েছে, বন্ধুদের সঙ্গে কনৌট প্লেসে ঘুরতে যাওয়ার সময় ভিড়ের প্ররোচনায় পড়ে সে ওই ভুল পদক্ষেপে জড়িয়ে পড়েছিল।

অনলাইনে ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়া সেই ভাইরাল ভিডিও ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, হাতজোড় করে অত্যন্ত অনুতপ্ত সুরে ওই কিশোরী বলছে, “সেখানে উপস্থিত লোকজন ও আন্দোলনের প্ররোচনাতেই আমি ভুল পা বাড়িয়েছিলাম। আমার বয়স মোটে ১৫ বছর। আমি যে অন্যায় করেছি, তা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়। আমি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজি ও তাঁর মায়ের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত অশালীন ও খারাপ কথা বলে ফেলেছি।” নিজের এই আচরণকে জীবনের প্রথম এবং চরম ভুল হিসেবে অভিহিত করে সে আরও যোগ করেছে, “আমি আজ সমগ্র দেশের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা ভিক্ষা করছি। নিজের এই কাজের জন্য আমি নিজেই এত বেশি লজ্জিত যে আয়নায় নিজের মুখ দেখতেও ঘৃণা হচ্ছে। দয়া করে আপনারা সবাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।” (যদিও স্বাধীনভাবে এই ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি)।

তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ঠিক এই ঘটনার প্রেক্ষাপটেই গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে একটি বিশেষ ভিডিও বার্তা পোস্ট করেছিলেন। সেই ভিডিওতে তিনি একেবারে স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে যাঁরা তাঁকে এবং তাঁর প্রয়াত মাকে নিয়ে কুরুচিকর ও অশালীন ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছিলেন, সেই দেশের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের তিনি সম্পূর্ণ মন থেকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সেই বার্তার মাধ্যমে উল্লেখ করেন, “আমার ব্যক্তিগত বিরুদ্ধে যে সমস্ত কুরুচিকর শব্দ চয়ন করা হয়েছিল তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। তবে এই তরুণ সমাজকে কঠোর আইনি শাস্তির মুখে ঠেলে না দিয়ে, বরং তাদের নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।” প্রধানমন্ত্রীর এই উদার ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমার বার্তার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধ্যেই ওই কিশোরীর ক্ষমা চাওয়ার ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসায় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে।

এই ঘটনার আইনি প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, গত ২৩ জুলাই যন্তর মন্তরের সেই হাই-ভোল্টেজ আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক পদের চরম অবমাননা করা এবং উস্কানিমূলক মন্তব্য করে জনশান্তি বিঘ্নিত করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গত ২৯ জুলাই নয়ডার এক্সপ্রেসওয়ে পুলিশ স্টেশনে একটি ‘জিরো এফআইআর’ (Zero FIR) রুজু করা হয়েছিল। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ৩৫২, ৩৫৩(১) এবং ৩৫৬(১) ধারার অধীনে এই মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। যেহেতু মামলাটি জিরো এফআইআর হিসেবে দায়ের হয়েছিল, তাই পরবর্তীকালে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের স্বার্থে তা দিল্লির সংসদ মার্গ বা পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় স্থানান্তরিত করা হয়। পুলিশি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ওই কিশোরী নয়ডার একটি নামী হাউজিং সোসাইটিতে তার মায়ের সঙ্গে বসবাস করত। ঘটনার পর পুলিশ যখন তদন্তের জন্য তাদের ফ্ল্যাটে পৌঁছায়, তখন দেখা যায় যে যন্তর মন্তরের প্রতিবাদের পর থেকেই সেই ফ্ল্যাটে চাবি ঝুলছে এবং কিশোরী ও তার মা সেখান থেকে সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গিয়েছেন।

এদিকে, এই সমগ্র আইনি প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে মুখ খুলেছে আন্দোলনকারী সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। নাবালিকা প্রতিবাদী শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা বা ক্রিমিনাল কেস দায়ের করার কঠোর সমালোচনা করেছে তারা। সিজেপি-র অন্যতম প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস এই বিষয়ে মন্তব্য করে জানিয়েছেন, “যে কোনো ধরনের আপত্তিকর বা অবমাননাকর ভাষাকে আমরা কখনোই সমর্থন করি না। কিন্তু স্রেফ মুখে বলা কোনো মৌখিক মন্তব্যের জেরে এ ভাবে তড়িঘড়ি ফৌজদারি মামলা ঠুকে দেওয়া হলে তা দেশের সংবিধানপ্রদত্ত বাক-স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের ওপর চরম আঘাত হানবে। যদি কারও সম্মানহানি হয়ে থাকে বা অনুভূতিতে আঘাত লেগে থাকে, তবে তাঁদের নিয়মতান্ত্রিক দেওয়ানি মানহানির (Defamation) মামলা করার পথ বেছে নেওয়া উচিত ছিল, এভাবে পুলিশি শক্তি দিয়ে হেনস্থা করা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়।”