বিশ্বকাপ বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে তুলকালাম! ট্রাম্পের যোগ থাকতেই পিছু হঠল ফিফা?

বেসরকারি সংস্থার কাছে ফুটবল বিশ্বকাপকে ‘বিক্রি’ করে দেওয়ার বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে শেষ পর্যন্ত সরে আসতে বাধ্য হলো ফিফা (FIFA)। পুরুষ ও মহিলাদের বিশ্বকাপ সহ সংস্থার প্রধান টুর্নামেন্টগুলির বাণিজ্যিক স্টেক বিক্রির এই খবর সামনে আসতেই বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভ এবং বিক্ষোভ শুরু হয়। ফিফার সদস্য দেশগুলি থেকে শুরু করে ইউরোপিয়ান ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা উয়েফা (UEFA)— প্রত্যেকেই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়। শেষপর্যন্ত প্রবল চাপের মুখে পড়ে নিজেদের পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয় ফিফা নেতৃত্ব।

কী ছিল ফিফার বিতর্কিত পরিকল্পনা?

ফিফা একটি নতুন বাণিজ্যিক ইউনিট গঠন করার পরিকল্পনা করেছিল, যা তাদের সমস্ত বড় টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক দিক পরিচালনা করবে। ওই নতুন ইউনিটের প্রায় ২০ শতাংশ মালিকানা বিক্রি করে ৪.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘরে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিল ফিফা। এই হিসেবে পুরো ফুটবল ব্যবসার মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসার পরেই চারদিক থেকে তীব্র সমালোচনা ধেয়ে আসে। উয়েফা সরাসরি অভিযোগ করে যে, ফিফা আসলে ফুটবলের ‘আত্মা বিক্রি’ করে দিতে চাইছে।

বয়কটের হুঁশিয়ারি ও উয়েফার অবস্থান

ইউরোপের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, বাইরের কোনো বিনিয়োগকারী শক্তির হাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই প্ল্যান প্রত্যাহার না করলে ফিফার টুর্নামেন্ট বয়কট করার মতো বড়সড় হুঁশিয়ারিও দেয় তারা। চারপাশের এই ভয়ঙ্কর অসন্তোষ ও বয়কটের মেঘ ঘনীভূত হতে দেখেই শেষ পর্যন্ত পিছু হঠে ফিফা।

শুক্রবার এক জরুরি বিবৃতিতে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জানান, সংস্থা আর এই প্রকল্প নিয়ে এগোবে না। তিনি বলেন, “সব পক্ষের মতামত মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। এরপর আমরা বুঝতে পেরেছি যে এই প্রকল্প ফুটবল বিশ্বে বিভাজন তৈরি করেছে, যা আমাদের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। আমাদের লক্ষ্য সবসময়ই ফুটবলকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং এর আরও উন্নতি সাধন করা।”

ফিফার অন্দরেও তীব্র অসন্তোষ ও পদত্যাগ

বাইরের বিরোধিতাই শুধু নয়, ফিফার এই প্ল্যানিং নিয়ে সংস্থার অন্দরেও তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধেছিল। এই সিদ্ধান্তের দিনই ফিফার অন্দরে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। ইনফান্তিনোর সিনিয়র উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো হঠাৎই নিজের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি এই বিনিয়োগের পরিকল্পনাকে ‘ফুটবলের জন্য একটি অত্যন্ত খারাপ চুক্তি’ বলে তোপ দাগেন। পাশাপাশি, ফিফার চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুর অভিযোগ করেন যে, ইনফান্তিনো সংস্থার কর্মীদের বিভ্রান্ত করেছেন এবং এটি কার্যত ‘এক ব্যক্তির প্রকল্প’ ছাড়া আর কিছুই নয়। মাত্র কয়েকদিনের প্রবল বিরোধিতায় এই পরিকল্পনা বাতিল হওয়াকে ফিফার জন্য বড় ধাক্কা বলেই মনে করছেন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যোগ ও মার্কিন পুঁজির সমীকরণ

ফিফার এই বিনিয়োগ প্রকল্পে মূল বিনিয়োগকারী হিসেবে নাম জড়িয়েছিল ‘থ্রাইভ ইটার্নাল’ (Thrive Eternal) নামের একটি ফান্ডের। এই সংস্থার নেতৃত্বে রয়েছেন জোশুয়া কুশনার, যিনি ‘থ্রাইভ ক্যাপিটাল’-এর প্রতিষ্ঠাতা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জোশুয়া কুশনার হলেন জ্যারেড কুশনারের ভাই, আর জ্যারেড কুশনার হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই। রাজনৈতিক মহলের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সমীকরণেই এই বাণিজ্যিক চুক্তির পরিকল্পনা হয়েছিল, যা শেষপর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের জেরে ভেস্তে গেল।