কফি, কাজ নাকি ঘুম? সারাদিন মাথায় কী ঘোরে আপনার? মানুষের মন নিয়ে গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য!

কফি পানের তীব্র ইচ্ছা, কর্মক্ষেত্রের চাপ কিংবা দিনশেষে একটু শান্তিতে ঘুমানোর ব্যাকুলতা—এই সাধারণ ভাবনাগুলো নিয়েই কাটে আধুনিক মানুষের দৈনন্দিন জীবন। তবে এই সারাদিনের চিন্তাভাবনার ধরন মানুষের সুখ ও জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির মাত্রা নির্ধারণ করে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ‘ক্লেয়ারমন্ট গ্র্যাজুয়েট ইউনিভার্সিটি’ এবং চীনের ‘উহান ইউনিভার্সিটি’-র একদল গবেষক মানুষের মনের ভাবনা বিশ্লেষণ করে সাধারণ মানুষকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি ১৯ থেকে ৭১ বছর বয়সী ২৫৮ জন মানুষের ওপর বিশেষ একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে চালানো হয়েছিল। প্রায় ২৩ হাজারের বেশি বাস্তব সময়ের তথ্য (Real-time Data) বিশ্লেষণ করে এই অভিনব ফলাফল সামনে এনেছেন অর্থনীতিবিদরা।
দিনের কোন ভাবনায় কতটা সময় কাটে মানুষের?
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মন প্রায় কখনোই সম্পূর্ণ খালি বা শূন্য থাকে না (মাত্র ১% ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম)। দিনের আলোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা বদলাতে থাকে—দিনের বেলা কাজ আর সন্ধ্যা নামলেই বিনোদনের দিকে ঝোঁকে মন।
শারীরিক ও মানসিক অনুভূতি (ক্লান্তি, ঘুম ইত্যাদি): মোট চিন্তার ২০% (১/৫ অংশ)
কাজের চিন্তা: ১৭%
খাবার ও পানীয় (কফি পানের ইচ্ছা): ১৪%
বিনোদন ও খেলাধুলা: ১০%
ব্যক্তিগত সম্পর্ক: ১০%
চাহিদার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রায় অর্ধেকজুড়েই ছিল খাবার বা এক কাপ কফি পানের ইচ্ছা। আর ২৯ শতাংশ মানুষ ব্যস্ততার মাঝে একটু বিশ্রাম বা ঘুমের কথা ভেবেছেন।
আপনি কোন ক্যাটাগরির মানুষ? গবেষকদের ৪ টি শ্রেণীবিভাগ
মানুষের প্রধান মানসিক চিন্তাকে ভিত্তি করে গবেষণায় মূলত ৪টি দলের সন্ধান পাওয়া গেছে:
১. চিন্তিত বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত (The Anxious/Worried)
এ দলের মানুষেরা যুদ্ধ, মহামারী, রাজনীতি ও বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে সাধারণের চেয়ে ৬০% বেশি চিন্তা করেন। নিজেদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, একা লাগা ও ব্যথা নিয়ে তাদের মন ভারাক্রান্ত থাকে। তবে এই মানসিক চাপ কাটাতে তারা অন্যদের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি গান শোনেন।
২. সংসার ও হিসাবমুখী (The Domestic & Practical)
বাস্তবমুখী ভাবনায় মশগুল থাকেন এরা। ঘরের কাজ, অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ, সিনেমা বা বইয়ের প্লট নিয়ে অন্যদের চেয়ে ৫০% বেশি চিন্তাভাবনা করেন তারা। এদের ভাবনায় ‘সমাধান’ ও ‘প্রক্রিয়া’র মতো শব্দ বারবার আসে।
৩. শরীর ও মনকেন্দ্রিক (Mind-Body Focused)
এদের গড় বয়স ৩২ এবং দুই-তৃতীয়াংশই নারী। নিজেদের শারীরিক অনুভূতি, বিষণ্ণতা, থেরাপি বা ভেতরের মানসিক অবস্থা নিয়ে এরা বেশি ভাবেন। অনাকাঙ্ক্ষিত বা হঠাৎ মাথায় আসা চিন্তার হার এই দলেই সবচেয়ে বেশি (২৮%)।
৪. ‘ওয়ার্ক-হার্ড, প্লে-হার্ড’ (The Balanced Achiever)
এদের ভাবনা কাজ ও বিনোদনের মধ্যে সমানভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে। কাজ নিয়ে ৫০% বেশি ভাবার পাশাপাশি শরীরচর্চা, জিম বা ভ্রমণ নিয়েও ২৫% বেশি চিন্তা করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, চার দলের মধ্যে এদের আয় ও আনন্দের মাত্রা সবচেয়ে বেশি!
মন যেমন ভাববে, জীবন তেমনই হবে!
রোমান সম্রাট ও বিখ্যাত দার্শনিক মার্কাস অরেলিয়াসের উক্তি—“আপনার জীবনের সুখ নির্ভর করে আপনার চিন্তার গুণমানের ওপর”। গবেষণায় সেই দর্শনেরই সত্যতা আবার প্রমাণিত হলো। ড. জোশুয়া তাসফ-সহ প্রবীণ গবেষকরা জানান, মানুষ ঠিক যে মুহূর্তে যা ভাবছে, তার ওপরই নির্ভর করছে তার তাৎক্ষণিক আনন্দ ও বিষাদ।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, মানুষের ভাবনা এক জায়গায় স্থির থাকে না। জীবনের বিভিন্ন সময় ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে মানুষ এক দল থেকে অন্য দলের ভাবনায় রূপান্তরিত হতে পারে।