অপরাধের রেকর্ড থাকলে মিলবে না আইনি সুরক্ষা! সিজেপি-র আন্দোলন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশ

NEET-UG প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি (CJP)-র নেতৃত্বে দেশজুড়ে চলা দীর্ঘ ছাত্র আন্দোলন নিয়ে অবশেষে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের সর্বোচ্চ আদালত অত্যন্ত কঠোর ভাষায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো যুক্তিতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বরদাস্ত করা হবে না এবং এক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র শিথিলতা দেখানো হবে না। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের (Surya Kant)-এর নেতৃত্বাধীন বিশেষ বেঞ্চ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, যেসব প্রতিবাদীর বিরুদ্ধে পূর্বে অপরাধমূলক রেকর্ড বা ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে, তাঁদের কোনো ধরনের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে না।

আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ও পর্যবেক্ষণ:
এদিন শীর্ষ আদালতের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করে বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র যাঁদের বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধের রেকর্ড বা কেস রয়েছে, শুধুমাত্র তাঁদের বিরুদ্ধেই কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। একইসঙ্গে আন্দোলনের সময় পুলিশি ধরপাকড়ে আটক হওয়া সমস্ত নাবালকদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সুপ্রিম কোর্টের এই ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশ একইসঙ্গে সমাজের দুই পক্ষের উদ্বেগকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে—একদিকে যেমন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে আহত হওয়া পুলিশ বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনাগুলিকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করা হয়েছে।

সংঘর্ষ ও আহত পুলিশকর্মীদের পরিবার নিয়ে উদ্বেগ:
স্মরণ করা যেতে পারে যে, সিজেপি-র এই দীর্ঘ আন্দোলনের সময় দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এবং তার আশপাশের সংবেদনশীল এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছিল, যার জেরে ২০০-রও বেশি পুলিশ কর্মী গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত অত্যন্ত কড়া সুরে মন্তব্য করেন, “যাঁরা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন, তাঁদের অবশ্যই আইনের সঠিক কাঠামোর আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। পাশাপাশি, এই ঘটনায় আহত হওয়া পুলিশ কর্মীদের পরিবারগুলির দীর্ঘ যন্ত্রণা ও উদ্বেগকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখা চলবে না, তাদের উদ্বেগকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।”

আদালত তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সেই পবিত্র প্রতিবাদের অধিকারের আড়ালে দাঁড়িয়ে হিংসা ছড়ানো, পাথর ছোড়া, কর্তব্যরত পুলিশের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালানো বা সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভাঙচুর করা কোনো অবস্থাতেই আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যে সমস্ত ছাত্রছাত্রী বা প্রতিবাদী সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের আন্দোলন চালিয়ে গেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের জোরজবরদস্তিমূলক বা দমনপীড়নমূলক ব্যবস্থা নেওয়া চলবে না। কিন্তু যাঁদের অতীতে অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে কিংবা যারা সরাসরি হিংসাত্মক কার্যকলাপে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।

পুলিশ কর্মীদের জীবন ও মর্যাদার সুরক্ষা:
কর্তব্যরত আহত পুলিশ কর্মীদের পরিবারের পক্ষ থেকে করা আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত বিশেষ সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করেছে। বহু পুলিশ সদস্য হিংসার ঘটনায় গুরুতর জখম হয়েছেন এবং তাঁদের পরিবারগুলি এখনও চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এই প্রসঙ্গ টেনে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জোরালোভাবে বলেন, “আইনরক্ষক পুলিশ কর্মীদের জীবন ও নিরাপত্তা আমজনতার মতোই সমানভাবে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করেন, তাই তাঁদের ওপর সুপরিকল্পিত হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।” আদালত মনে করে, নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে কেবল একপক্ষের কথা শুনলে চলবে না, বরং আক্রান্ত পুলিশ কর্মীদের দুর্দশাও সমান গুরুত্ব দিয়ে শোনা উচিত।

সব মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া:
সুপ্রিম কোর্টের এই সুষম ও কঠোর নির্দেশের পর আন্দোলনরত বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে যেমন স্বস্তি প্রকাশ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে এর ফলে নিরপরাধ সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় হেনস্থা অনেকটাই বন্ধ হবে; তেমনই অন্যদিকে পুলিশ কর্মী ও তাঁদের বিভিন্ন সংগঠনও আদালতের এই ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকায় যথেষ্ট সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায়কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করছে সচেতন মহল।