অভিষেকের আমতলার কার্যালয় ভাঙা মামলায় বড় মোড়! হাইকোর্টে কী দাবি করল রাজ্য সরকার?

তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমতলার বিতর্কিত কার্যালয় ভাঙার মামলায় কলকাতা হাইকোর্টে এক চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ দাবি করল রাজ্য সরকার। মঙ্গলবার হাইকোর্টের শুনানিতে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল (AG) সুরজিৎ মিত্র আদালতে সওয়াল করে জানান যে, পাঁচতলা ওই ভবনের যে অংশটি নিয়ে মামলা করা হয়েছে, আইনগতভাবে সেই অংশটি বা মামলাকারীর নির্দিষ্ট অংশ আদৌ ভাঙা হয়নি। অবৈধ নির্মাণের অভিযোগে প্রশাসন যে নির্দিষ্ট অংশটি ভেঙেছে, তার মালিক মামলাকারী স্বয়ং নন। তবে উভয়পক্ষের বিস্তারিত সওয়াল-জবাব শোনার পর কলকাতা হাইকোর্ট আগামী ৬ অগস্ট পর্যন্ত ওই কার্যালয় ভাঙার প্রক্রিয়ার ওপর কড়া স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

মামলার প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই:
অবৈধ নির্মাণের জোরালো অভিযোগে গত ১৮ জুলাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই পাঁচতলা কার্যালয়টি ভাঙার কাজ শুরু করা হয়েছিল। এই বুলডোজার অভিযানের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অভিষেক। মঙ্গলবার সেই মামলার শুনানিতে রাজ্যের এজি আদালতে দাবি করেন, মামলাকারী দাবি করেছেন যে তাঁরা ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ (Leaps and Bounds) সংস্থার সুবাদে ৫০৯ এবং ৫১২ দাগ নম্বরের জমির মালিক। কিন্তু প্রশাসন স্পষ্টতই সেই অংশটি ভাঙেনি। এজি-র দাবি, যে অংশটি ভেঙে অপসারণ করা হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি দাগ নম্বর অর্থাৎ ৫০৭ দাগের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ মামলাকারীর নিজস্ব দাগ নম্বরের অংশ ভাঙা হয়নি দাবি করে তিনি অবিলম্বে আদালতকে আগের দেওয়া স্থিতাবস্থার নির্দেশ তুলে নেওয়ার আর্জি জানান।

অন্যদিকে, অভিষেকের আইনজীবী তথা প্রবীণ কৌঁসুলী কিশোর দত্ত এদিন আদালতে পাল্টা সওয়াল করে জোরালো দাবি করেন যে, ওই কার্যালয় ভাঙার ক্ষেত্রে গ্রাম পঞ্চায়েত বা স্থানীয় প্রশাসনের আইনি নিয়ম ও বিধি একেবারেই মানা হয়নি। এমনকি ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ সংস্থাকে আইনানুগ ন্যূনতম কোনো নোটিস পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। উভয়পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ সওয়াল-জবাব শোনার পর বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত আমতলার ওই কার্যালয় ভাঙার ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থিতাবস্থা বজায় রাখার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। ওই দিন দুপুর দুটোয় এই মামলার পরবর্তী শুনানি ধার্য করা হয়েছে।

হঠাৎ কেন আমতলার কার্যালয় ভাঙার উদ্যোগ নিয়েছিল প্রশাসন?
আইনি ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, সুশান্ত মণ্ডল নামক এক ব্যক্তি এর আগে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন যে কোনো ধরনের বৈধ নির্মাণ নকশা বা স্যাংশন ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে এই পাঁচতলা সুবিশাল ভবনটি তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি, এলাকার একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেছিলেন যে, একটি পুরোনো বেকারির নির্দিষ্ট জায়গা জবরদস্তি দখল করেই আমতলায় অভিষেকের এই কার্যালয়টি নির্মাণ করা হয়েছিল।

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদে সুশান্ত মণ্ডলের সেই পুরনো অভিযোগ নতুন করে খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয় এবং জেলা পরিষদের কর্তারা নোটিস পাঠাতে শুরু করেন। গত ৩০ জুন দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটি সরকারি নোটিস পাঠানো হয়। যেহেতু এই সম্পত্তি ও ব্যবসার সঙ্গে ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস’ সংস্থাটি যুক্ত এবং অমিত বন্দ্যোপাধ্যায় ওই কোম্পানির অন্যতম ডিরেক্টর, তাই তাঁকে এই নোটিস পাঠানো হয়েছিল।

এরপর গত ১৫ জুলাই দুপুর দুটোর সময় অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত—উভয় পক্ষকেই সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নোটিসে পরিষ্কার জানানো হয়েছিল যে সুশান্ত মণ্ডলের অভিযোগের ভিত্তিতেই এই তলব এবং উভয় পক্ষকে তাদের দাবির সপক্ষে আইনি প্রমাণপত্র নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু অভিযোগ, প্রশাসনের সেই নোটিস হাতে পেয়েও নির্দিষ্ট দিনে কার্যালয় বা সংস্থার কর্তৃপক্ষের তরফে অমিত বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা তাঁর কোনো প্রতিনিধি হাজিরা দেননি।

এই অসহযোগিতার পরই জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুনরায় নোটিস পাঠিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, নিয়মবহির্ভূতভাবে তৈরি আমতলার এই বিশাল কার্যালয় ভেঙে ফেলা হবে। সেই প্রশাসনিক নোটিসের ভিত্তিতেই গত ১৮ জুলাই সকালে বুলডোজার নিয়ে কার্যালয় ভাঙার কাজ শুরু করে প্রশাসন। আর তার বিরুদ্ধেই আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আইনি লড়াই শুরু করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আগামী ৬ আগস্ট মামলার পরবর্তী রায়ের দিকেই এখন সকলের নজর।