ছাত্রদের সংসদ চলো অভিযানে পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়ে কড়া নজর সুপ্রিম কোর্টের! নিরপেক্ষ তদন্তের পক্ষে সওয়াল প্রধান বিচারপতির

ছাত্রদের ‘সংসদ চলো অভিযানে’ পুলিশের ভূমিকা ও বলপ্রয়োগ সংক্রান্ত একগুচ্ছ মামলার শুনানিতে আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠোর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি. মোহনার সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ গত ২০ জুলাইয়ের ‘পার্লামেন্ট মার্চ’-এ বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশি দমনপীড়ন সংক্রান্ত একাধিক মামলার শুনানি করেন। মামলাকারীদের প্রধান দাবি ছিল, অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সারা দেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি অভিন্ন নির্দেশিকা তৈরি করা হোক। শুনানির শুরুতেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে দেন যে, নির্দোষ মানুষের ওপর সীমা লঙ্ঘন করে বা অতিরিক্ত অত্যাচার করা হয়ে থাকলে আইনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা অবশ্যই নেওয়া হবে। তবে তার জন্য সবার আগে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আদালতের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ ছিল যে, ঘটনার প্রকৃত দায়িত্ব কার, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ না করা হলে এহেন তদন্তের কোনো বাস্তব তাৎপর্যই থাকে না।
শুনানিপর্বে আদালতের সামনে উঠে আসে পুলিশি অত্যাচারের একাধিক লোমহর্ষক চিত্র। প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন আদালতে সওয়াল করে জানান যে, এই সমস্যা কেবল দিল্লির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মধ্যপ্রদেশ, নাগপুর এবং বিহারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একই ধরনের পুলিশি বলপ্রয়োগের অভিযোগ সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিভিন্ন আবেদনে একাধিক গুরুতর ও ভয়াবহ অভিযোগ আনা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট ঘটনায় প্যালেট গানের আঘাতে ১৯ বছরের এক যুবকের চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও আবার বৈদ্যুতিক ব্যাটন বা টেজার ব্যবহারের ফলে এক তরুণীকে আইসিইউ (ICU)-তে পর্যন্ত ভর্তি করতে হয়েছে। এমনকি পেরেক-লাগানো লাঠি দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর আঘাত হেনে প্রাণঘাতী জখম করার অভিযোগও আদালতের নজরে এসেছে। এর পাশাপাশি, একজন কর্মরত সাংবাদিককে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ, সাদা পোশাকের পুলিশকর্মীদের দ্বারা সংগঠিত হিংসা এবং কোনো ধরনের প্ররোচনা ছাড়াই এক তরুণীকে পুলিশ আধিকারিকের চড় মারার ন্যক্কারজনক ঘটনাও আদালতে পেশ করা হয়েছে। পুলিশি এই অতিরিক্ত ও মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে সম্প্রতি আরও একটি নতুন আবেদন জমা পড়েছে।
প্রধান বিচারপতি এদিন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করেন যে, এই আন্দোলনটি ছিল সম্পূর্ণ সংবিধানসম্মত দাবিতে ছাত্রদের এক শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক বিক্ষোভ, যা আমাদের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে তিনি এও উল্লেখ করেন যে, অনেক সময় এই ধরনের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে বহিরাগত বা অসামাজিক উপাদান ঢুকে পড়ে পরিস্থিতিকে হিংসাত্মক ও জটিল করে তোলে। ভবিষ্যতে টিয়ার গ্যাস, জলকামান বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা পুলিশ কীভাবে এবং ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করবে, তা নিয়েও নতুন করে গভীর ভাবনার সময় এসেছে বলে আদালতের অভিমত। অন্যদিকে, আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন আদালতের নজর আকর্ষণ করে একটি ভিডিও প্রমাণের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে দেখা গিয়েছে একজন সহকারী উপ-পরিদর্শক (ASI) নিজে দাঁড়িয়ে থেকে একটি সরকারি বা বেসরকারি গাড়ির কাচ ভেঙে দিচ্ছেন। তাঁর জোরালো বক্তব্য ছিল, এর দায় কেবল মাঠপর্যায়ের সাধারণ কর্মীদের ওপর চাপালে চলবে না, বরং অপরাধের পূর্ণ জবাবদিহি উঁচুতলা পর্যন্ত নিশ্চিত করতে হবে; তা না হলে পুলিশ বাহিনীর ভেতর থেকে এই অনৈতিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি কখনোই দূর করা সম্ভব হবে না।