অবশেষে পদত্যাগ ধর্মেন্দ্র প্রধানের! নিট কেলেঙ্কারির উত্তাপে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর বিদায়ে কেঁপে উঠল রাজনৈতিক মহল

ভারতের অন্যতম আলোচিত এবং চাঞ্চল্যকর নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির তীব্র চাপের মুখে অবশেষে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। দীর্ঘ মাস ধরে চলা দেশব্যাপী বিক্ষোভ, লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ক্ষোভ এবং বিরোধী দলগুলির লাগাতার চাপের পর অবশেষে শনিবার তিনি তাঁর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ পদে থেকে এই ধরনের নজিরবিহীন ব্যর্থতার নৈতিক দায় সম্পূর্ণভাবে নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে তাঁর এই ঐতিহাসিক পদত্যাগ রাজনৈতিক মহলে এক বিরাট ভূকম্পন সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি, ঠিক এর দু’দিন আগেই অপরপ্রান্তে অস্ট্রেলিয়াতেও শিক্ষা দফতরের একটি বড়সড় কেলেঙ্কারির দায় কাঁধে নিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন সে দেশের শিক্ষামন্ত্রী ইভয়েট বেরি। দুটি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ঘটনার কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও নৈতিক দায়বদ্ধতার দিক থেকে এই দুটি পদত্যাগ বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
ভারতে বিগত কয়েক মাস ধরে নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং নানা অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। দেশজুড়ে লাখ লাখ ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা রাস্তায় নেমে তুমুল আন্দোলন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। কেবল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিই নয়, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সচেতন নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক সংগঠন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর সরাসরি পদত্যাগের দাবি জোরালো করে তুলেছিল। তাদের মূল যুক্তি ছিল, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও কোটি কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে এই ভয়াবহ ব্যর্থতার সম্পূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব ধর্মেন্দ্র প্রধানের ওপরই বর্তায়। প্রবল রাজনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনের অন্দরে তৈরি হওয়া অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জেরে শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। নিজের পদত্যাগের চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, কোনো বিশেষ স্বার্থান্বেষী শক্তি বা দেশবিরোধী গোষ্ঠী যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই ন্যায্য আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে ফায়দা তুলতে না পারে।
অন্যদিকে, ঠিক এর দু’দিন আগেই অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপিটাল টেরিটরি (ACT)-র শিক্ষামন্ত্রী ইভয়েট বেরি মন্ত্রিসভা থেকে হঠাৎ পদত্যাগ করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। তবে তাঁর পদত্যাগের কারণ ভারতের ঘটনার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। এসিডি ইন্টিগ্রিটি কমিশনের বিশদ তদন্তে উঠে আসে যে, ক্যাম্পবেল প্রাইমারি স্কুলের সংস্কারের সঙ্গে জড়িত প্রায় ১৮.৮ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বিশাল টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। যদিও নিরপেক্ষ সেই তদন্তে স্পষ্ট ভাষায় প্রমাণিত হয়েছিল যে, ইভয়েট বেরির ব্যক্তিগত কোনো দুর্নীতি বা সরাসরি আর্থিক অপরাধের সঙ্গে কোনো যোগ ছিল না। মূলত শিক্ষা দফতরের তৎকালীন প্রধান এবং মন্ত্রীর প্রাক্তন চিফ অব স্টাফ যৌথভাবে একটি প্রভাবশালী ইউনিয়নকে বেআইনিভাবে ওই টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং অবাক করার মতো বিষয় হলো, ব্যক্তিগত স্তরে নিজের কোনো ধরনের অপরাধ বা দোষ প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও গোটা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার দায় ইভয়েট বেরি সম্পূর্ণ নিজের কাঁধে তুলে নেন। পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করার সময় অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এই তদন্তের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে সংসদের অন্দরে কোনো ধরনের অযথা রাজনৈতিক নাটক বা কাদা ছোড়াছুড়ি হোক, তা তিনি কিছুতেই চান না। নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সততা ও নৈতিকতার সঙ্গে কোনো আপস না করেই তিনি মন্ত্রিসভা ছাড়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। দুই দেশের এই ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ঘটনাগুলি আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিরিখে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। এক দেশ যখন প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার জেরে মন্ত্রী হারায়, আর এক দেশ যখন অন্য কর্মচারীর দুর্নীতির দায় নিজের মাথায় নিয়ে পদ ছাড়ে, তখন এটাই প্রমাণিত হয় যে—যেকোনো বড় দপ্তরে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে শেষ পর্যন্ত শীর্ষ নেতৃত্বকে তার রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় এড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।