ভোটের বয়স তো ১৮, এবার কি ২১ বছরেই বিধায়ক-সাংসদ হওয়া যাবে? বড় প্রস্তাব তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রীর!

রাজনীতির আঙিনায় তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ আরও সুদৃঢ় করার পক্ষে এবার এক ঐতিহাসিক ও সাহসী সওয়াল করলেন তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি। তাঁর দ্ব্যর্থহীন দাবি, দেশের লোকসভা এবং রাজ্যসভার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যের প্রাদেশিক বিধানসভাগুলিতেও আরও বেশি সংখ্যায় কমবয়সি ও তরুণ প্রতিনিধিদের পাঠানো অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান তরুণ সমাজ ঠিক কী ভাবছে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিকল্পনা কী—তা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে এবং নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় তাদের সরাসরি শামিল করতেই এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে তিনি জোরালোভাবে মনে করেন। এই বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই সাংসদ ও বিধায়ক হওয়ার ন্যূনতম বয়স বর্তমানের ২৫ বছর থেকে কমিয়ে সরাসরি ২১ বছর করার পক্ষে সওয়াল করেছেন তিনি। খুব শীঘ্রই এই মর্মে তেলেঙ্গানা বিধানসভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রস্তাব পেশ হতে চলেছে এবং সেই আইনি প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

সংবিধানের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, দেশের লোকসভার সদস্য কিংবা যেকোনো রাজ্যের প্রাদেশিক বিধানসভায় বিধায়ক পদপ্রার্থী হতে গেলে ন্যূনতম বয়স অন্তত ২৫ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি, ৩০ বছরের কম বয়সে উচ্চকক্ষ অর্থাৎ রাজ্যসভার সাংসদ হওয়া যায় না। তবে দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর এই প্রচলিত ব্যবস্থায় আমূল বদল আনতে চান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর স্পষ্ট ইচ্ছা, দেশের কোনো নাগরিকের বয়স ২১ বছর পূর্ণ হলেই যাতে তাঁকে আইনসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচনে লড়ার পূর্ণ আইনি ছাড়পত্র দেওয়া হয়। নিজের এই যুক্তির সমর্থনে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদাহরণও তুলে ধরেন রেবন্ত রেড্ডি।

এদিন বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওয়ের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথাও সসম্মানে স্মরণ করেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, নরসিমা রাওয়ের সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার ফলেই অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশে মাত্র ২১ বছর বয়সেই পুরসভা কিংবা পঞ্চায়েতের মতো স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রতিনিধি হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছিল। সেই একই জনমুখী ও গণতান্ত্রিক মডেলকেই এবার দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা অর্থাৎ রাজ্যসভা, লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভাগুলিতেও চালু করতে বদ্ধপরিকর তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী।

গত শনিবার সন্ধ্যায় হায়দরাবাদের নেকলেস রোড চত্বরে CJP-র চলমান আন্দোলনের জোরালো সমর্থনে কংগ্রেসের একটি বিশাল প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সেই জনবহুল মিছিলে মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী, একাধিক কংগ্রেস সাংসদ, বিধায়ক, বিশিষ্ট জনপ্রতিনিধি এবং দলের প্রবীণ নেতারা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। মিছিলের শেষে এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্র সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন, “জনতার আন্দোলনের প্রচণ্ড চাপের কাছে শেষমেশ হার মানতে বাধ্য হলেন প্রধানমন্ত্রী! বাধ্য হয়েই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়েছে।” তরুণ সমাজের এই ঐতিহাসিক জয় এবং আন্দোলনের সাফল্যকে কুর্নিশ জানিয়ে রাজনীতিতে যুবশক্তিকে আরও বেশি করে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে চান তিনি।

উল্লেখ্য, ভারতে বর্তমানে ১৮ বছর বয়স হলেই দেশের যেকোনো নাগরিক সাবালক হিসেবে ভোটদান করতে পারেন। কিন্তু অতীতে পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। একসময় ২১ বছর বয়স না হলে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা যেত না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ১৯৮৮ সালে সংবিধানের ৬১তম সংশোধনী ঘটিয়ে ভোটদানের ন্যূনতম বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করেছিলেন, যা ভারতের গণতন্ত্রে এক যুগান্তকারী অধ্যায় রচনা করেছিল। বর্তমান সময়ের নিরিখে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত দুটি বৃহত্তম গণতন্ত্র হলো আমেরিকা ও ব্রিটেন। আমেরিকার ক্ষেত্রে আইনসভার উচ্চকক্ষ বা সেনেটে প্রবেশের ন্যূনতম বয়স ৩০ বছর এবং প্রতিনিধি সভা বা হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর। অন্যদিকে, ব্রিটেনের উচ্চকক্ষ বা হাউস অফ লর্ডসের সদস্য হতে গেলে সর্বনিম্ন বয়স ২১ বছর প্রয়োজন হলেও, অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে নিম্নকক্ষ বা হাউস অফ কমন্সের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে বয়স মাত্র ১৮ বছর হলেই চলে। তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাবটি যদি ভবিষ্যতে আইন হিসেবে কার্যকর হয়, তবে ভারত এবং গ্রেট ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর মধ্যে ঐতিহাসিক মিল আরও অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।