পা ছিল একসময়ে! কোটি কোটি বছর আগে কীভাবে এবং কেন হারিয়ে গেল সাপের পা? জানলে চমকে যাবেন!

মাটিতে বিদ্যুৎ গতিতে ছোটার ক্ষমতা কিংবা গাছে চড়া বা পানিতে ভাসার অদ্ভুত দক্ষতার কারণে সাপ সবসময়ই কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। ডাঙার বেশিরভাগ প্রাণী চলার জন্য পায়ের ওপর নির্ভর করলেও, পা ছাড়া একটি প্রাণী কীভাবে এত নিখুঁতভাবে সব বাধা পেরিয়ে চলাচল করে, তা ভাবায় অনেককেই। তবে আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এই প্রাণীটির শরীরের কাঠামোর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর বৈজ্ঞানিক ও বিবর্তনীয় ইতিহাস। প্রাচীনকালের বিভিন্ন গবেষণা এবং ফসিল বা জীবাশ্ম প্রমাণ করে যে, সাপ সবসময় পা-বিহীন ছিল না। ‘নেচার’ ও ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’-এর মতো আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় নিশ্চিত করা হয়েছে যে, কোটি কোটি বছর আগে সাপের শরীরে পা ছিল। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো আর্জেন্টিনার প্রাচীন সাপের জীবাশ্ম ‘নাজাশ রিয়োনেগ্রিনা’, যা প্রায় ১০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বাস করত এবং যার পেছনের পা দুটি ছোট কিন্তু স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। একইভাবে প্রায় ১২ কোটি বছর পুরনো ‘টেট্রাপোডোফিস’ নামের সরীসৃপের চারটি পা ছিল বলে ইঙ্গিত মিলেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, সাপ মূলত টিকটিকির মতো সরীসৃপ থেকে বিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে। দীর্ঘ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সাপের পাগুলো ছোট হতে শুরু করে এবং একসময় তা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়। জীবাশ্মের পাশাপাশি বংশগতিবিদ্যা বা জেনেটিক গবেষণাও এই সত্যকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছে। ২০১৬ সালে সাপের ভ্রূণের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, আধুনিক সাপের শরীরে পা গজানোর জন্য প্রয়োজনীয় কিছু জেনেটিক কোষ এখনও সুপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছে। টিকটিকির দেহে যে জিনগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করে, সাপের দেহে সেগুলোর কার্যকারিতা বহুগুণ কমে গেছে। ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার বিবর্তনবাদী বায়োলজিস্ট মার্টিন কোহেন এবং অন্যান্য গবেষকরা আবিষ্কার করেন যে, ‘সনিক হেজহগ’ নামের একটি বিশেষ জিন টিকটিকির পায়ের আকার নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করলেও, সাপের ক্ষেত্রে এই জিন নিয়ন্ত্রণকারী প্রয়োজনীয় ডিএনএ সেগমেন্টগুলোর অনুপস্থিতি দেখা যায়। ডিএনএর এই পরিবর্তনের ফলেই সাপের ভ্রূণ বৃদ্ধির সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন তৈরি ব্যাহত হয় এবং পা গজানোর প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। তবে মজার বিষয় হলো, কিছু সাপের শরীরে আজও তাদের পূর্বপুরুষদের পায়ের সামান্য অবশেষের চিহ্ন রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, পাইথন বা অজগরের লেজের কাছাকাছি ‘স্পার্স’ নামক ছোট কাঠামো দেখা যায়, যেগুলোকে বিবর্তনের ফলে হারিয়ে যাওয়া পেছনের পায়ের অবশিষ্ট অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির জিনতত্ত্ববিদ অ্যাক্সেল উইজেলের নেতৃত্বে পরিচালিত তুলনামূলক জিনোম গবেষণায় পাইথনের পাশাপাশি ভাইপার ও কোবরার মতো আধুনিক সাপের জিন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে যে, জিনগত পরিবর্তন এবং ডিএনএ হারানোর প্রক্রিয়াই সাপের পা হারানোর বিবর্তনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।