রাজ্যসভায় চরম হট্টগোল! বন্দে মাতরম অবমাননা বিরোধী কড়া বিল পেশ করতেই তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা

বিরোধী দলের তীব্র হট্টগোল এবং তুমুল শোরগোলের মাঝেই দেশের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ সংক্রান্ত একটি নতুন বিল পেশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রায় রাজ্যসভায় ‘জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ (সংশোধন) বিল ২০২৬’ আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করেন, যা রাজনৈতিক মহলে মূলত ‘বন্দে মাতরম বিল’ নামেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। তবে বিলটি পেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধী দলগুলির সাংসদরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সভার অন্দরে প্রবল হট্টগোল শুরু করেন, যার জেরে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিলটি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ধরনের আলোচনা বা বিতর্ক চালানো সম্ভব হয়নি। ফলস্বরূপ, বিরোধীদের এই ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে পড়ে রাজ্যসভার কার্যক্রম আগামী সোমবার (২৭ জুলাই, ২০২৬) পর্যন্ত মুলতবি করতে বাধ্য হন সভার সভাপতি।
কেন্দ্রীয় সরকারের আনা এই নতুন সংশোধনী বিল অনুযায়ী, এখন থেকে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’-কে অবমাননা করলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে বর্তমান নরেন্দ্র মোদী সরকার জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’-এর সমকক্ষ আইনি অধিকার ও সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রদান করতে চলেছে ‘বন্দে মাতরম’-কেও। বিরোধীদের সমস্ত প্রতিবাদের জোরালো জবাব দিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রায় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, যারা এই জনহিতকর বিলটির ভুল অর্থ বের করে এর বিরোধিতা করছেন, তাঁরা মূলত দেশের সাধারণ সদনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন।
এই বিশেষ সংশোধনী বিলটির মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কী?
এতদিন পর্যন্ত ১৯৭১ সালের প্রণীত ‘জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ আইন’ শুধুমাত্র দেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’, জাতীয় পতাকা এবং ভারতীয় সংবিধানের মান রক্ষার্থে প্রযোজ্য ছিল। বর্তমানের এই নতুন সংশোধনীটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’-কেও ওই একই আইনের সুরক্ষিত পরিধিতে নিয়ে এসেছে। ফলে এখন থেকে যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বন্দে মাতরম’-এর অমর্যাদা বা অবমাননা করেন, কাউকে এটি গাওয়ায় বাধা প্রদান করেন, কিংবা এর পরিবেশনে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন, তবে তা একটি জামিনঅযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের আদালত কর্তৃক সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত জেলের মেয়াদ, আর্থিক জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার কড়া বিধান রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নতুন জারি করা নির্দেশিকা অনুযায়ী, সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠান এবং জনসমাবেশে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ ছয়টি শ্লোকই সুনির্দিষ্ট নিয়মে গাওয়া বা বাজানো এবং মূল জাতীয় সঙ্গীতের ঠিক আগেই এটি পরিবেশন করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কেন হঠাৎ এই সংশোধনী বিলটি আনার প্রয়োজন পড়ল?
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৫০ সালের ২৪শে জানুয়ারি ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ দেশের গণপরিষদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’-কে দেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’-এর ঠিক সমতুল্য সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হবে। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে দীর্ঘ সাড়ে সাত দশকেও তা ১৯৭১ সালের মূল আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পরবর্তীতে অমর সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি এই কালজয়ী গানটির ১৮৭৫ সালে রচিত হওয়ার ১৫০তম বার্ষিকী অত্যন্ত গৌরবের সঙ্গে স্মরণের প্রাক্কালে, কেন্দ্রীয় সরকার অবশেষে এটিকে পূর্ণাঙ্গ আইনি সুরক্ষা বলয়ে নিয়ে আসার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।