৯ বছরের জটিল হার্নিয়া ও অতিরিক্ত স্থূলতা! ২৭ কেজি ওজন কমিয়ে ঐতিহাসিক অস্ত্রোপচারে নতুন জীবন মহিলার

দীর্ঘ ৯ বছরের যন্ত্রণা এবং চরম শারীরিক জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেন কলকাতার এক ৪৭ বছরের মহিলা। ভেন্ট্রাল হার্নিয়ার মতো জটিল সমস্যা, মাত্রাতিরিক্ত স্থূলতা এবং একাধিক শারীরিক অসুস্থতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চিকিৎসকদের নিখুঁত পরিকল্পনা ও সাফল্যের হাত ধরে নতুন জীবন ফিরে পেলেন তিনি।
কী ছিল রোগীর সমস্যা?
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৪ সালে। সে সময় ওই মহিলার ভেন্ট্রাল হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার হয়েছিল। অপারেশন সফল হলেও তার ফলাফল স্থায়ী হয়নি। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ফের ফিরে আসে হার্নিয়া এবং প্রায় ৯ বছর ধরে তা আকারে ক্রমশ বাড়তে থাকে।
যখন তিনি আলিপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হন, তখন তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পৌঁছেছিল। তাঁর বডি মাস ইনডেক্স (BMI) ছিল ৪৯। হার্নিয়ার পাশাপাশি তিনি টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হাইপোথাইরয়েডিজমে ভুগছিলেন।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা দেখতে পান যে, তাঁর হার্নিয়াটি ‘লস অব ডোমেন’ (Loss of Domain) পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, পেটের ভেতরের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে হার্নিয়ার থলির মধ্যে ঝুলে থাকায় তা হুট করে পেটের ভেতর ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে সার্জারি করা অসম্ভব প্রায় ছিল। এই অবস্থায় সরাসরি অপারেশন করলে সেলাই খুলে যাওয়া, সংক্রমণ বা শ্বাসকষ্টের মতো মারাত্মক ঝুঁকির আশঙ্কা ছিল।
ওজন কমানোই হয়ে ওঠে মূল চাবিকাঠি
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের আগে রোগীকে ওজন কমানোর পরামর্শ দেন। সেই অনুযায়ী তাঁর ল্যাপারোস্কোপিক স্লিভ গ্যাস্ট্রেকটমি বা ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি (Bariatric Surgery) করা হয়। এর ফলে পরবর্তী মাত্র সাত মাসের মধ্যে তাঁর প্রায় ২৭ কেজি ওজন কমে যায়।
ওজন কমার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। অতিরিক্ত চর্বি ঝরে যাওয়ায় পেটের দেওয়ালের ওপর থেকে চাপ অনেকটাই কমে এবং শরীর বড় অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুত হয়। চিকিৎসকদের মতে, এই সুপরিকল্পিত ওজন হ্রাসই ছিল পুরো চিকিৎসার টার্নিং পয়েন্ট।
কীভাবে হল চূড়ান্ত অস্ত্রোপচার?
ওজন কমার পর তিন সপ্তাহ আগে জেনারেল সার্জন ডা. সারফরাজ জে. বেগের নেতৃত্বে একটি বিশেষ চিকিৎসক দল ‘ট্রান্সভারসাস অ্যাবডোমিনিস রিলিজ উইথ পেরিটোনিয়াল ফ্ল্যাপ রিপেয়ার’ (TAR Plus) পদ্ধতিতে হার্নিয়ার চূড়ান্ত অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। এই বিশেষ পদ্ধতিতে পেটের পেশিতে অতিরিক্ত টান না দিয়েই দেওয়াল পুনর্গঠন করা হয় এবং পেশির নিচে বড় মেশ বসিয়ে তা শক্ত করা হয়।
পাশাপাশি, দীর্ঘদিনের হার্নিয়ার কারণে ঝুলে যাওয়া অতিরিক্ত ত্বক অপসারণের জন্য ‘ভার্টিক্যাল প্যানিকিউলেকটমি’-ও করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাত্র এক সপ্তাহ পরেই তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে নিয়মিত চেক-আপের পর তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বিপদমুক্ত আছেন।