‘মিছিল করতে দেব না!’ স্মার্ট মিটার বিতর্কের মাঝে বাম-এসইউসিআইকে সরাসরি হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর

গত কয়েক মাস ধরে স্মার্ট মিটার (Smart Meter) বসানো কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে চলা বিতর্ক এবং বিক্ষোভ এবার এক নতুন রাজনৈতিক মোড় নিল। একদিকে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন যে, বসতবাড়িতে প্রি-পেইড স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না। অন্যদিকে, সেই ঘোষণার পরেই সিপিএম ও এসইউসিআই-কে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিলেন, “মিছিল বন্ধ। আপনাদের আর মিছিল করার সুযোগ দেব না।” সরকারের এই দ্বিমুখী বার্তাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র শোরগোল শুরু হয়েছে। বিরোধীদের প্রশ্ন, সরকার কি তবে জনমতের চাপে নীতিগত অবস্থান বদল করল, নাকি আন্দোলনের রাজনৈতিক ধার ভোঁতা করতেই এই কৌশল নিয়েছে?
বিধানসভায় কী বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী?
বিদ্যুৎ দফতরের বাজেট নিয়ে জবাবি ভাষণে বুধবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জানান, সরকার সবসময় সাধারণ মানুষের কথা শুনেই সিদ্ধান্ত নেয়। বামেদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বামপন্থীদের হাওয়া বেরিয়ে যাবে। মিছিল বন্ধ। আপনাদের আর এসইউসিআইকে মিছিল করার সুযোগ দেব না।” শুধু তাই নয়, বিরোধীদের সতর্ক করে তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে এটি কোনও দুর্বল সরকার নয়, বরং একটি শক্তিশালী সরকার। উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করলে সবকিছুর ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
নীতি বদল, না ব্যাখ্যার পরিবর্তন?
মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরেই প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি পূর্বের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের পুরোপুরি সরে আসা? কারণ, এর আগে সরকারের তরফে জানানো হয়েছিল যে প্রথম পর্যায়ে সরকারি দফতর, স্কুল-কলেজ এবং সরকারি কর্মচারীদের বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসানো হবে এবং ধাপে ধাপে অন্যান্য ক্ষেত্রেও তা ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
কিন্তু সাধারণ গৃহস্থালির ক্ষেত্রে স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক নয় বলে মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় ঘোষণা করায় বিরোধীদের দাবি, এটি সরকারের স্পষ্ট নীতিগত ‘ইউ-টার্ন’। যদিও প্রশাসনের একটি অংশের মতে, সরকার কখনোই সাধারণ মানুষের ওপর জোর করে স্মার্ট মিটার চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলেনি, নতুন ঘোষণায় সেই অবস্থানই কেবল স্পষ্ট করা হয়েছে।
আন্দোলনের চাপেই কি সুর নরম?
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গত কয়েক মাস ধরে স্মার্ট মিটারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে আসছে সিপিএম, এসইউসিআই এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎ গ্রাহক সংগঠন। পথসভা, বিক্ষোভ ও গণস্বাক্ষর অভিযানের মাধ্যমে তাদের দাবি ছিল, প্রি-পেইড মিটার এলে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
অল বেঙ্গল ইলেকট্রিসিটি কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত বিশ্বাস দাবি করেছেন, “সরকার আন্দোলনের চাপেই বারবার অবস্থান বদল করতে বাধ্য হচ্ছে।” একই সুরে এসইউসিআই (কমিউনিস্ট)-এর রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্যও মন্তব্য করেন, “আমাদের আন্দোলন যদি গুরুত্বহীনই হতো, তবে মুখ্যমন্ত্রীকে আলাদা করে আমাদের নাম করতে হতো না। উনি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে মানুষের চাপের মুখেই সরকার এই ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।”
বিতর্কের কেন্দ্রে গণতান্ত্রিক অধিকার
স্মার্ট মিটারের প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক বিতর্কের গণ্ডী পেরিয়ে বিষয়টি এখন পুরোপুরি গণতান্ত্রিক অধিকারে এসে ঠেকেছে। মুখ্যমন্ত্রীর ‘মিছিল করতে দেব না’ মন্তব্যকে হাতিয়ার করে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন বা মিছিল করার মৌলিক অধিকার খর্ব করার এই বার্তা কতটা আইনসম্মত?
অন্যদিকে, শাসকদলের সাফাই—বিরোধীরা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। সেই কারণেই প্রশাসন ও সরকার এই বিষয়ে কড়া বার্তা দিতে বাধ্য হয়েছে। আগামী দিনে স্মার্ট মিটার বসানোর প্রক্রিয়া কোন দিকে মোড় নেয় এবং বিরোধীদের আন্দোলন কী রূপ নেয়, সেটাই এখন দেখার।