“উনি ৩১-এ কোথায় থাকেন দেখব!” একুশে জুলাইয়ের হুঙ্কারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পালটা তোপ দেগে বিধানসভায় তুলকালাম!

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে রাজনৈতিক উত্তাপ একেবারে চরমে পৌঁছে গেল। একুশে জুলাইয়ের ঐতিহাসিক মঞ্চ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে হুংকার দিয়েছিলেন, ঠিক তার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই বিধানসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে তার দাঁতে দাঁত চাপা জবাব দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এদিন বিধানসভার অন্দরে বিরোধী ও শাসক শিবিরের তীব্র বাকযুদ্ধে রাজনৈতিক পারদ কয়েক ডিগ্রি চড়ে যায়। মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে দাবি করেন যে, বিগত দিনে ডায়মন্ড হারবারে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যত ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন, আগামী দিনে তার থেকেও ঢের বেশি ভোটে তাঁকে হারিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফেরত পাঠানো হবে।
২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে ২০३১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং বর্তমান শাসক শিবিরের ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক রাজনৈতিক মন্তব্য করেছিলেন অভিষেক। এদিনের বিধানসভায় সেই সমস্ত মন্তব্যের অত্যন্ত কড়া ও সরাসরি জবাব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “ওই ছোঁড়াকে, প্রতিষ্ঠিত চোরকে, আমি আজ বলে গেলাম ও জেলের ভিতরে থাকবে নাকি বাইরে থাকবে, তা ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে। সাহস থাকলে আগামী দিনে ডায়মন্ড হারবারে লড়ুন, আপনাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলছি আপনি যত ভোটে জিতেছেন, তার থেকেও অনেক বেশি ভোটে আপনাকে হারিয়ে দেব।” এদিনের এই হাই-ভোল্টেজ অধিবেশনে দুই পক্ষের সংঘাতে বিধানসভার ভেতরকার পরিবেশ পুরোপুরি তেতে ওঠে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ ও মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী আরও তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বলেন, “গতকাল বড় বড় কথা ও আওয়াজ দেওয়া হয়েছে! বলা হচ্ছে ডায়েরির নোটবুকে লিখে রাখতে, কারণ ২০৩১ সালে হিসেব নাকি নেওয়া হবে! উনি একুশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলছেন হিসেব হবে, কিন্তু উনি একুশ বা একত্রিশ সালে রাজনৈতিকভাবে কোথায় থাকেন, সেটা আগে আমি নিজে চোখে দেখব! মাত্র আড়াই হাজার লোক নিয়ে বড় বড় কথা বলা হচ্ছে! আমি যদি একটা সাধারণ গ্রাম পঞ্চায়েতেও সভা করতে যাই, তবে এর চারগুণ বেশি লোক সমাগম হয়।”
শুধু তাই নয়, এদিন বিধানসভার ফ্লোর থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে ভাইপো-পন্থী তৃণমূল দলের নাম-নিশানা পুরোপুরি মুছে ফেলার চরম হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারী জোরালো ভাষায় বলেন, “এই ভাইপো-পন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের শিকড় সহ নাম-নিশানা আমরা এই বাংলা থেকে চিরতরে মুছে দেব। উনি বলছেন হিসেব করবেন? আগে তো উনি রাজনৈতিক ময়দানে বা বাইরে থাকুন, তবে তো উনি হিসেব করার কথা ভাববেন!” এদিনের এই অধিবেশনে কেবল বর্তমান শাসক শিবিরই নয়, বরং বিগত বামফ্রন্ট আমলের দীর্ঘ চৌত্রিশ বছরের শাসনকাল এবং বর্তমান তৃণমূল আমলের দুর্নীতির তীব্র তুলনামূলক সমালোচনাও করেন তিনি। তাঁর স্পষ্ট দাবি, সিপিএম তাদের দীর্ঘ শাসনামলে রাজনৈতিক দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছিল, আর পরবর্তীকালে তৃণমূল কংগ্রেস এসে সেই দুর্নীতিকে একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
দুর্নীতি ইস্যুতে কাউকেই একচুলও ছাড় দেওয়া হবে না বলে এদিন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “শুধু চোর তৃণমূল দলকেই নয়, এর পাশাপাশি অতীত ও বর্তমানের কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত সিপিএম নেতাকেও আমরা একবিন্দু ছাড়ব না। অবশ্য বাম আমলের সমর মুখোপাধ্যায় বা সমীর জানাদের মতো প্রকৃত সৎ নেতাদের কোনো ভয় নেই বা তাঁদের চিন্তার কোনো কারণ নেই। কিন্তু বাকি যারা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের প্রত্যেকের নিশ্চিত জেলে যাওয়া আটকানো যাবে না এবং তাঁদের অবৈধ সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা ক্রোক করা হবে।” প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রসঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন যে, প্রশাসন চাইলে গত একুশে জুলাইয়ের সভা খুব সহজেই আটকে দিতে পারত, কিন্তু গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখতেই সরকার কাউকেও বাধা দেয়নি। সবমিলিয়ে, অভিষেকের মন্তব্যের এই কড়া পালটা জবাব রাজ্য রাজনীতিতে নতুন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।