সংসদ থেকে দূরে কেন বসতে হয় ধর্না? দিল্লির যন্তর মন্তরকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানলে চমকে যাবেন!

দিল্লিতে যেকোনও নতুন এবং বড়সড় সমস্যা উঠলেই, তরুণ বা শিক্ষার্থীদের স্লোগানে রাজপথ কেঁপে উঠলেই একটা দৃশ্য অত্যন্ত চেনা ও নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়—বিশাল পুলিশি ব্যারিকেড, জলকামান, আর বাস ভরতি করে ধরপাকড়ের মহড়া। আন্দোলনকারীদের জোর করে বা প্রিজন ভ্যানে তুলে যেখানে পৌঁছে দেওয়া হয়, তা কোনও সাধারণ পুলিশ লকআপ নয়, বরং দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘যন্তর মন্তর’। কিন্তু গভীরভাবে ভেবে দেখলে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, ভারতের মতো এত বিশাল এবং শক্তিশালী এক গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ দেখানোর জন্য কেন শুধুই এই নির্দিষ্ট গলিটাকেই বেছে নেওয়া হয়? কেন দেশের সংসদ ভবন বা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছাকাছি কোনও বড় রাজপথে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ানোও প্রায় অপরাধের সামিল বলে গণ্য করা হয়?
এই সম্পূর্ণ গল্পের ঐতিহাসিক সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে, ১৯৯৩ সালের প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে। তবে এর মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালে, যখন প্রখ্যাত কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকায়েতের নেতৃত্বে প্রায় ৫ লাখেরও বেশি কৃষক দিল্লির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বোট ক্লাব’ (Boat Club) এলাকা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছিলেন। ইন্ডিয়া গেটের সবুজ লনে তখন লাখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়, গৃহপালিত গবাদিপশু আর ধোঁয়া ওঠা উনুনের রান্নার ধুম পড়ে গিয়েছিল। টানা বেশ কয়েক দিন ধরে এমন পরিস্থিতিতে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছিল দেশের প্রধান কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকা। ক্ষমতার অলিন্দে তখন চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
সেই আন্দোলনের তীব্র ধাক্কা সামলাতে না পেরে ১৯৯৩ সালে দেশের আদালত ও সরকার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে—বোট ক্লাবে চিরকালের মতো সব ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে সুস্থ ও সচল গণতন্ত্রে জনগণের ক্ষোভ উগরে দেওয়ার জন্য তো একটা নির্দিষ্ট জায়গা থাকতেই হয়! তাই বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া হল ঐতিহাসিক কেন্দ্র যন্তর মন্তরের পাশের রাস্তাটিকে। শুধু প্রশাসনিক নিয়মকানুনই নয়, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়েও সাংবিধানিকভাবে সিলমোহর পড়েছে এই নির্দিষ্ট স্থানে। ২০১৮ সালে দেওয়া এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক রায়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়—যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা প্রতিটি নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার (Fundamental Right)। আদালত তার পর্যবেক্ষণে মন্তব্য করে, “গণতন্ত্রে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ থাকা অত্যন্ত আবশ্যক।”
তা সত্ত্বেও প্রশ্ন থেকেই যায়, প্রতিবাদের জন্য শেষ পর্যন্ত যন্তর মন্তরই কেন নির্দিষ্ট করা হলো? আসলে, এর নেপথ্যে রয়েছে অত্যন্ত কঠোর প্রশাসনিক এবং নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট ছক:
প্রথমত, মাইক বাজবে, কিন্তু সেই কানফাটা আওয়াজ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছাবে না: যন্তর মন্তর দিল্লির হৃদপিণ্ডে অবস্থিত হলেও, প্রশাসনিক ভবন বা সংসদ ভবন থেকে এটিকে একটি নিরাপদ শারীরিক দূরত্বে রাখা হয়েছে। এর ফলে মিডিয়ার আলো বা কভারেজ যেমন সহজে মেলে, তেমনই সরকারের দৈনন্দিন কাজকর্মে এক ফোঁটাও ব্যাঘাত ঘটে না।
দ্বিতীয়ত, কঠোর আইনি বন্দোবস্ত বা বিএনএস ১৬৩ (BNS 163) ধারা: ভারতীয় ন্যায় সংহিতার এই বিশেষ আইন জারি করে পুলিশ সবসময় চারপাশের এলাকায় পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েতের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাখে। ফলস্বরূপ, যন্তর মন্তরের নির্দিষ্ট এই গণ্ডি পেরিয়ে কোনও মিছিল যদি সংসদের দিকে পা বাড়াতে চায়, তবে মুহূর্তের মধ্যে নামিয়ে আনা হয় পুলিশের লাঠি ও প্রিজন ভ্যান।
তৃতীয়ত, ‘প্রতিবাদ’ হবে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে: যন্তর মন্তরে শৌচাগার, পানীয় জল এবং অস্থায়ী মঞ্চ বানানোর মতো কিছু নূন্যতম সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে, যাতে বিক্ষোভকারীরা বছরের পর বছর ধরে সেখানে বসে থাকলেও দিল্লির সামগ্রিক সাধারণ জীবনযাত্রা সামান্যতমও অচল না হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ের শিক্ষার্থী বা তরুণ প্রজন্মের (Gen Z) আন্দোলনগুলি কোনও গতানুগতিক রাজনৈতিক দলের মতো আগে থেকে চিঠি দিয়ে লিখিত অনুমতি নিয়ে শুরু হয় না। এই আন্দোলনগুলি মূলত দানা বাঁধে সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল দুনিয়ায়, এবং নিমেষের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে। সবমিলিয়ে দিল্লির বুকে যন্তর মন্তরই হয়ে ওঠে আন্দোলনকারীদের জন্য সবচেয়ে আইনি সুরক্ষা বেষ্টিত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একমাত্র স্থান। একদিকে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, অন্যদিকে আদালতের রক্ষা কবচ—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই রাজপথের তীব্র আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ঠাঁই পায় এই এক চিলতে ছোট্ট রাস্তায়। অনেক প্রবীণ রাজনৈতিক সমালোচক তাই গভীর ব্যঙ্গের সুরে বলেন—যন্তর মন্তর আসলে প্রেসার কুকারের সেই পরিচিত ‘সেফটি ভ্যালভ’-এর মতো, যেখানে সাধারণ নাগরিককে ক্ষোভ উগরে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু সেই ক্ষোভের তীব্র আঁচ যাতে ক্ষমতার অলিন্দে বা গাস সিংহাসনে না পৌঁছায়, তার পাকা ও নিশ্চিত ব্যবস্থাও আগে থেকেই করে রাখা হয়!