টাটা ট্রাস্টে বড় ধাক্কা! রতন টাটার মৃত্যুর পরই কেন হঠাৎ সরে দাঁড়াচ্ছেন ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় সিং?

টাটা গ্রুপের কর্পোরেট মহলে চলতি উত্তেজনার মধ্যেই এবার এক বিরাট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পালাবদলের খবর সামনে এসেছে। টাটা ট্রাস্টসের ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় সিং আগামী ১৪ই আগস্ট স্যার রতন টাটা ট্রাস্টের (এসআরটিটি) ট্রাস্টি পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়াতে চলেছেন, এবং ঠিক সেদিনই তাঁর বর্তমান মেয়াদ শেষ হচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে এই সুপ্রাচীন ট্রাস্টের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকার পর তাঁর এই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমান এই খবরটি এমন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে যখন পুরো ট্রাস্টটি তীব্র অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং দেশের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়া নজরদারির মুখে পড়ে চরম অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে। ৭৮ বছর বয়সি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বিজয় সিং শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যম ‘ইকোনমিক টাইমস’ (ET)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি এই মেয়াদের পর আর নতুন করে পুনর্নিযুক্তির জন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না।
নিজের সরে দাঁড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজয় সিং অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কিংবদন্তি শিল্পপতি রতন টাটার প্রয়াণের পর থেকে টাটা ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশে যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, তা তাঁর মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে একধরনের বড় সংশয় তৈরি করেছে। তিনি বলেন, “আমি আমার বর্তমান বয়সের পর এসআরটিটি-র মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আর নিজের দায়িত্ব চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক নই এবং আমার বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অন্য কোনো ট্রাস্টেও পুনর্নিয়োগের জন্য আর কোনো আবেদন করব না।” তবে সব ট্রাস্ট থেকে তিনি সরে যাচ্ছেন না; বিজয় সিং আরও এক বছরের জন্য স্যার দোরাবজি টাটা ট্রাস্টের ট্রাস্টি হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে যাবেন। শিল্প মহলের মতে, তাঁর এই হঠাৎ প্রস্থান এমন কিছু ধারাবাহিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে ঘটেছে যা টাটা ট্রাস্টগুলোর অন্দরে চলা দীর্ঘদিনের সুপ্ত ও প্রকাশ্য মতপার্থক্যকে এক নিমেষে সর্বসমক্ষে নিয়ে এসেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই শক্তিশালী ট্রাস্টগুলো যৌথভাবে হোল্ডিং কোম্পানি টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ শেয়ারের নিরঙ্কুশ মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করে।
বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল মূলত গত মে মাসেই, যখন ট্রাস্টি মেহলি মিস্ত্রির তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে বিজয় সিং এবং সহ-সভাপতি ভেনু শ্রীনিবাসন টাটা এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট (টিইডিটি) থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। মেহলি মিস্ত্রি পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল যে, বাই হীরাবাই জামশেদজি টাটা নবসারি চ্যারিটেবল ইনস্টিটিউশনের ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিজয় সিং ও শ্রীনিবাসন আদৌ সমস্ত আইনি যোগ্যতা পূরণ করছেন কি না। ট্রাস্টের ১৯২৩ সালের মূল ডিডের কঠোর শর্ত অনুযায়ী, যেকোনো ট্রাস্টিকে বাধ্যতামূলকভাবে পার্সি জরথুস্ত্রবাদী এবং মুম্বাইয়ের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে, যে মাপকাঠিতে তাদের অবস্থানকে ঘিরে আইনি চ্যালেঞ্জ ছোঁড়া হয়েছিল। তাছাড়া, সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত সূত্রগুলোর মতে, টাটা সন্স কোম্পানিকে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত (Listing) করার পক্ষে বিজয় সিংয়ের ইতিপূর্বে দেওয়া কিছু প্রকাশ্য মন্তব্য এসআরটিটি-র সহ-ট্রাস্টিদের কাছ থেকে পরবর্তী মেয়াদের জন্য সর্বসম্মত সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনাকে চিরতরে একপ্রকার ক্ষীণ করে তুলেছিল।
বিজয় সিংয়ের এই পদত্যাগের পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে এসে উপস্থিত হয়েছে যখন স্যার রতন টাটা ট্রাস্ট বোর্ড তাদের কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক সভাই করতে পারছে না। স্থায়ী ট্রাস্টি নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য বেশ কিছু সংবেদনশীল প্রশাসনিক অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত খোদ মহারাষ্ট্রের চ্যারিটি কমিশনার এই ট্রাস্টটিকে সমস্ত ধরনের বোর্ড মিটিং বা সভা করা থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। বর্তমানে এসআরটিটি-র পরিচালনা বোর্ডে দায়িত্ব পালন করছেন চেয়ারম্যান নোয়েল এন. টাটা, ভেনু শ্রীনিবাসন, বিজয় সিং, জিমি এন. টাটা, জাহাঙ্গীর এইচ.সি. জাহাঙ্গীর এবং বিশিষ্ট আইনজীবী ড্যারিয়াস খাম্বাট্টা। কিন্তু সার্বিক এই স্থবিরতার কারণে গ্রুপের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
মূলত স্যার রতন টাটা ট্রাস্ট এবং স্যার দোরাবজি টাটা ট্রাস্ট যৌথভাবেই টাটা সন্সের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারের অধিকারী। গত মে মাসেই টাটা সন্সের বোর্ডে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব পর্যালোচনা করার জন্য ট্রাস্টগুলোর একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত ছিল, যেখানে নতুন মনোনীত পরিচালকদের নাম চূড়ান্ত করার কথা ছিল। কিন্তু চলমান তীব্র আইনি জটিলতা ও কোন্দলের জেরে সেই বৈঠকগুলো শেষ পর্যন্ত স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় কতৃপক্ষ। পাশাপাশি, টাটা সন্সকে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করার সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সুবিধা নিয়ে বিজয় সিং এবং ভেনু শ্রীনিবাসনের প্রকাশ্য মন্তব্যগুলোও আলোচ্যসূচিতে থাকার কথা ছিল। তবে তাঁর এই অবস্থানকে বর্তমান চেয়ারম্যান নোয়েল টাটার নেতৃত্বাধীন ট্রাস্টগুলোর মূল ভাবনার সম্পূর্ণ বিচ্যুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ বর্তমান নেতৃত্ব টাটা সন্সকে একটি অ-তালিকাভুক্ত বেসরকারি সংস্থা হিসেবেই বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গত বছর বিজয় সিংকে টাটা সন্সের বোর্ডে আর পুনর্নিয়োগ করা হয়নি। সবমিলিয়ে, টাটা ট্রাস্টের অন্দরের এই ক্ষমতার লড়াই আগামী দিনে কর্পোরেট মহলে কী রূপ নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।