অভাবকে বুড়ো আঙুল! ধূপগুড়ির প্রত্যন্ত গ্রামের দিনমজুরের ছেলে টোটন নিটে বাজাল সফলতার জয়ডঙ্কা!

অভাব যার নিত্যসঙ্গী এবং ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস যেখানে প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতা, সেখানে দাঁড়িয়ে বড় স্বপ্ন দেখা বিলাসিতা বৈ কিছু নয়। কিন্তু সেই কঠিন ও নির্মম বাস্তবতাকে এক লহমায় বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিল ধূপগুড়ির এক প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণ। কোনো নামী-দামী কোচিং সেন্টারের ঝাঁ-চকচকে আলো কিংবা অগাধ অর্থের বিলাসিতা তার ছিল না; তার সম্বল ছিল কেবল দুচোখ ভরা সুগভীর স্বপ্ন আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ার এক অদম্য জেদ। চরম দারিদ্র্যের কালো মেঘ বুক চিরে সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা তথা নিট (NEET)-এ অবিশ্বাস্য সাফল্য ছিনিয়ে এনেছে গধেয়ারকুঠী গ্রামের কৃতি সন্তান টোটন সরকার। সদ্য প্রকাশিত ২০২৬ সালের নিট পরীক্ষার ফলাফলে ৭২০ নম্বরের মধ্যে ৪৬৪ নম্বর অর্জন করেছে সে। সর্বভারতীয় স্তরে তপশিলি জাতি (এসসি) ক্যাটাগরির মেধাতালিকায় তার চমকপ্রদ র্যাঙ্ক ৮,১৭৮। জীবনের প্রথম দফায় ব্যর্থতা এলেও দ্বিতীয়বারের অদম্য প্রচেষ্টায় টোটনের এই ঐতিহাসিক জয়ে আজ আনন্দাশ্রু ও খুশির জোয়ারে ভাসছে গোটা গধেয়ারকুঠী গ্রাম।
গ্রামের কুঁড়েঘর থেকে শিলিগুড়ির চিলতে মেস—স্বপ্নের খোঁজে এই দীর্ঘ লড়াই একেবারেই সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই অভাবের সঙ্গে কুস্তি লড়ে বড় হয়ে ওঠা টোটনের জন্মভিটায় পড়াশোনার তেমন কোনো উন্নত পরিকাঠামো বা উপযুক্ত পরিবেশ ছিল না। কিন্তু চিকিৎসক হওয়ার অদম্য জেদ তাকে সারাদিন তাড়া করে বেড়াত। সেই অদম্য স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতেই একদিন বুকভরা আশা নিয়ে গ্রাম ছেড়ে সোজা পাড়ি জমিয়েছিল শিলিগুড়িতে। সেখানে একটি একচিলতে ঘরে থেকে দিনরাত এক করে চালিয়ে গেছে তার কঠোর সংগ্রাম। প্রথম দফায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলেও টোটনের লড়াকু মানসিকতা একটুও ভাঙেনি। বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে পরাজয়কে শক্তি করে সে দ্বিগুণ উৎসাহে দ্বিতীয়বার ময়দানে নামে। আর শেষ পর্যন্ত তার সেই আপসহীন মেধা, একাগ্রতা ও নিখাদ নিষ্ঠার কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হলো সমস্ত সামাজিক ও আর্থিক বাধা-বিপত্তি।
নিজের এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পর হবু ডাক্তারের স্পষ্ট বার্তা, “গ্রামাঞ্চলের ছেলে-মেয়েরাও ইচ্ছা থাকলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে। এর জন্য কোনো রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা নয়, কেবল দরকার অদম্য জেদ ও কঠোর পরিশ্রম।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের গ্রামীণ এলাকার অনেকের মনেই বিজ্ঞান বিষয়টিকে ঘিরে একধরনের অযৌক্তিক ভীতি কাজ করে। আমি একজন চিকিৎসক হয়ে গ্রামের কোমলমতি শিশুদের মন থেকে সেই ভীতি চিরতরে দূর করতে চাই। বিজ্ঞানকে ভয় নয়, বরং তাকে ভালোবাসতে শিখতে হবে।” টোটন শুধু নিজের দরিদ্র পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেননি, বরং ভাঙা ঘরের অন্ধকার দূর করে উত্তরবঙ্গের হাজার হাজার দুঃস্থ ও মেধাবী পড়ুয়াকে নতুন আলোর দিশা দেখিয়েছেন। তিনি আবারও প্রমাণ করে দিলেন যে লড়াইটা যদি সততার সঙ্গে হয়, তবে উত্তরবঙ্গের এই মোটা কুয়াশাও কোনোদিন স্বপ্নের সূর্যকে ঢেকে রাখতে পারে না। এখন তার দুই চোখে শুধুই স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে হাসিমুখে নিজের গ্রামে ফিরে আসার সোনালী অপেক্ষা।