তেরো দিনে ‘মৃত্যুভোজ’ না দিলে কি সত্যিই পিতৃ দোষ হয়? জানুন গরুড় পুরাণের আসল সত্য!

প্রিয়জনের প্রয়াণের পর পালিত বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও নিয়মকানুন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা ধরনের কৌতূহল ও শঙ্কা কাজ করে। বিশেষ করে সবচেয়ে সাধারণ যে প্রশ্নটি বারবার ঘুরেফিরে আসে, তা হলো—ত্রয়োদশ দিনে জাঁকজমকপূর্ণ ‘মৃত্যুভোজ’ বা ভোজন সভার আয়োজন না করলে কি পরিবারে পিতৃ দোষ বা অভিশাপের প্রভাব পড়ে? বর্তমানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় অনেক পরিবারই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বড় পরিসরে ভোজের আয়োজন করতে সক্ষম হয় না। এর ফলে তাদের মনে এক অজানা ভয় কাজ করে যে, হয়তো এর কারণে তাদের মৃত পূর্বপুরুষরা অসন্তুষ্ট হতে পারেন। তবে প্রখ্যাত ধর্মীয় বিশ্বাস ও শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, এই ধারণার কোনো সরাসরি বা বাধ্যতামূলক ভিত্তি নেই। শুধুমাত্র ত্রয়োদশ দিনে বড় করে ‘মৃত্যুভোজ’ অনুষ্ঠান না করলেই যে পিতৃ দোষ বা কোপ পড়তে পারে, এমন কোনো সত্যতা শাস্ত্রে নেই। এর মূল কারণ হলো, সনাতন হিন্দু ঐতিহ্যে ত্রয়োদশ দিনের প্রকৃত তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি এবং তাঁর কল্যাণের উদ্দেশ্যে পালিত ধর্মীয় রীতিনীতির সঙ্গে জড়িত, কোনো বিলাসবহুল সামাজিক ভোজের আয়োজনের সঙ্গে নয়।
সনাতন ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ গরুড় পুরাণ অনুসারে, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর ত্রয়োদশ দিনটি তাঁর অমর আত্মার শান্তি কামনা, পরকালের যাত্রাপথ সুগম করা এবং প্রেতলোক থেকে তাঁর মুক্তির উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার অত্যন্ত পবিত্র দিন। এই বিশেষ দিনে পরিবারের সদস্যরা পরম ভক্তি ও নিয়ম মেনে বিশেষ পূজা, তর্পণ, পিণ্ডদান এবং দান-ধ্যান করে থাকেন। সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ধর্মীয় ও পবিত্র আচার-অনুষ্ঠানগুলোই মূলত মৃত আত্মার শান্তি ও মুক্তি নিশ্চিত করে।
অন্যদিকে, হিন্দুধর্মে পিতৃ দোষের ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। শুধুমাত্র মৃত্যুভোজের অনুপস্থিতির সঙ্গে পিতৃ দোষের কোনো যোগসূত্র নেই। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, যখন কোনো ব্যক্তি বা পরিবার তাদের মৃত পূর্বপুরুষদের প্রতি দৈনন্দিন ও বার্ষিক ধর্মীয় কর্তব্য বা শ্রদ্ধা জ্ঞাপনে চরম অবহেলা করেন, তখনই পিতৃ দোষের সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, যদি কোনো পরিবার সচেতনভাবে বা অবহেলার কারণে তর্পণ, পিণ্ডদান বা শ্রাদ্ধের মতো অপরিহার্য রীতিনীতিগুলো পালন না করে, তবেই পূর্বপুরুষরা অসন্তুষ্ট হতে পারেন। সুতরাং, পিতৃ দোষ কখনোই মৃত্যুভোজ না করার কারণে ঘটে না, বরং পূর্বপুরুষদের প্রতি নির্ধারিত ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই এর সৃষ্টি হয়।
ধর্মশাস্ত্র ও প্রাচীন ঐতিহ্য স্পষ্টভাবে বলে যে, ত্রয়োদশ দিনে কোনো বিশাল আকারের সামাজিক ভোজের আয়োজন করা বা ভোজসভা করা একেবারেই বাধ্যতামূলক নয়। শাস্ত্র মূলত কয়েকজন বিদ্বান ব্রাহ্মণকে সসম্মানে আহার করানো, প্রয়োজনীয় দান-খয়রাত করা এবং প্রয়াগ বা অন্যান্য স্থানে প্রয়াত আত্মার সদগতির জন্য প্রার্থনা করার ওপর সর্বাধিক জোর দিয়েছে। তাই যে সমস্ত পরিবারের বড় পরিসরে কোনো ভোজের আয়োজন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাঁদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ধর্মীয় বিশ্বাস বলে যে, মৃত্যুর পর জাগতিক আড়ম্বর বা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের চেয়ে নিঃস্বার্থ সেবা ও দানের গুরুত্ব অনেক বেশি। শাস্ত্রে এও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, ক্ষুধার্ত ও অভাবী মানুষকে আহার করানো, দুস্থদের সাহায্য করা কিংবা প্রয়াতের স্মরণে নিঃস্বার্থ দান করা অত্যন্ত পুণ্যময় ও ফলদায়ক কাজ। পরিশেষে এটাই প্রমাণিত হয় যে, নিখাদ ভক্তি ও প্রকৃত বিশ্বাসই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। সামাজিক চাপে বিশাল ভোজের আয়োজন না করে ভক্তিভরে তর্পণ, পিণ্ডদান ও অভাবী মানুষের সেবা করাই ধর্মে সর্বোচ্চ স্থান পেয়েছে।