বলিউডের প্রথম ‘জুবিলি স্টার’! পকেটে মাত্র ৫০ টাকা নিয়ে মুম্বইয়ে আসা রাজেন্দ্র কুমারের অজানা গল্প!

হিন্দি চলচ্চিত্র তথা ভারতীয় সিনেমার স্বর্ণযুগের অন্যতম সফল এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক ছিলেন রাজেন্দ্র কুমার (Rajendra Kumar)। ১৯২৯ সালের ২০ জুলাই তিনি ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোটে (বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থিত) এক সম্ভ্রান্ত পাঞ্জাবি হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের মারাত্মক ট্র্যাজেডির পর তাঁর পরিবার সমস্ত সম্পত্তি ও সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব অবস্থায় মুম্বইয়ে চলে আসে। মূলত সেখান থেকেই তাঁর জীবনের কঠিন লড়াই এবং ভাগ্য অন্বেষণের রোমাঞ্চকর যাত্রা শুরু হয়।

একসময় যে রাজেন্দ্র কুমার পেশাদার অভিনেতা হওয়ার বদলে চলচ্চিত্র পরিচালক হতে চেয়েছিলেন, কালক্রমে তিনিই বলিউডের ইতিহাসে ‘জুবিলি কুমার’ হিসাবে অমর হয়ে ওঠেন। ১৯৬০-এর দশকে তাঁর অভিনীত পর পর বেশ কয়েকটি ছবি বক্সঅফিসে টানা ২৫ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সফল ব্যবসা করে ইতিহাস তৈরি করেছিল। দীর্ঘ চার দশকের বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনে তিনি ৮০টিরও বেশি সিনেমায় অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেছেন। আজ তাঁর ৯৯তম জন্মবার্ষিকীতে, রইল এই কিংবদন্তি অভিনেতাকে ঘিরে নানা অজানা কাহিনি ও রোমাঞ্চকর গল্প।

অভিনেতা নয়, হতে চেয়েছিলেন পরিচালক: দেশভাগের পর তখনকার বোম্বে অর্থাৎ বর্তমানের মুম্বইয়ে এসে রাজেন্দ্র কুমার প্রথম পাঁচ বছর বিশিষ্ট পরিচালক এইচ এস রাওয়ালের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। শুরুর দিকে তাঁর ক্যামেরার সামনে অর্থাৎ নায়ক হওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না, তিনি চিরকাল ক্যামেরার পেছনে থেকেই কাজ করতে চেয়েছিলেন। দেশভাগের সময় শিয়ালকোটের ধনী ক্ষত্রীয় পরিবারের এই সন্তানকে সব সম্পত্তি হারিয়ে শূন্যহাতে ভারতে আসতে হয়েছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিনি যখন বোম্বেতে ভাগ্যান্বেষণে আসেন, তখন তাঁর পকেটে মাত্র ৫০ টাকা সম্বল ছিল।

সিনেমায় রাজেন্দ্র কুমারের ‘জুবিলি কুমার’ তকমা: ১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বচন’ সিনেমায় তিনি প্রথম মুখ্য ভূমিকায় অভিনয়ের সুবর্ণ সুযোগ পান। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর অসাধারণ অভিনয় দক্ষতায় তিনি সাধারণ মানুষের মনে গভীর জায়গা তৈরি করে নিতে সক্ষম হন। ১৯৬০-এর দশকে রাজেন্দ্র কুমারের কোনো সিনেমা হলে মুক্তি পাওয়া মানেই তা টানা ২৫ সপ্তাহ অর্থাৎ সিলভার জুবিলি কিংবা ৫০ সপ্তাহ গোল্ডেন জুবিলি পার করবেই। তাঁর অভিনীত ‘সঙ্গম’, ‘আরজু’, ‘মেরে মেহবুব’ ও ‘সুরজ’-এর মতো কালজয়ী ছবিগুলো এই অভাবনীয় সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

মেলোড্রামা ও রোমান্টিক ঘরানায় রাজেন্দ্রর নতুন রূপ: দিলীপ কুমারের ট্র্যাজেডি ঘরানার রাজত্বের পর, রাজেন্দ্র কুমার পর্দায় এক ধরনের সহজ-সরল, আবেগঘন ও মার্জিত রোমান্টিক নায়কের এক দারুণ ভাবমূর্তি তৈরি করেন, যা তৎকালীন ভারতীয় দর্শকদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। ‘ধুল কা ফুল’ কিংবা ‘তালাশ’-এর মতো সিনেমাগুলো যে কারণে আজও দর্শক দরবারে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সমাদৃত।

কালজয়ী সঙ্গীত উপহার: তাঁর ছবির সুর ও গানগুলো যেমন: “তু হিন্দু বনেগা না মুসলমান বনেগা” কিংবা “ইয়ে মেরা প্রেম পত্র”- ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের স্বর্ণযুগ গঠনে এক বিশাল ও ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে। তালিকা এখানেই শেষ নয়, ‘বাহারো ফুল বরসাও’ থেকে শুরু করে “কৌন হ্যায় জো সপনমেঁ আয়া”, “তেরে মেরে সপ্নে অব এক রং হ্যায়”-এর মতো অবিস্মরণীয় গান আজও সঙ্গীতপ্রেমীরা গুনগুন করেন। কিন্তু সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ১৯৬০-এর দশকে হিন্দি ছবিতে গান থাকা অত্যন্ত বাধ্যতামূলক ছিল। অথচ রাজেন্দ্র কুমার অভিনীত বি আর চোপড়ার বিখ্যাত কোর্টরুম ড্রামা ‘কানুন’ (১৯৬০)-এ একটিও গান ছিল না। তা সত্ত্বেও গান ছাড়াই ছবিটি বক্সঅফিসে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় পুরস্কার জেতে।

রাজেন্দ্রর ‘লাকি বাংলো’ কেনেন রাজেশ খান্না: রাজেন্দ্র কুমার মুম্বইয়ের কার্টার রোডে সমুদ্রের ধারে একটি সুন্দর বাংলো কিনে সেটির নাম রেখেছিলেন ‘ডিম্পল’ (তাঁর নিজের মেয়ের নামানুসারে)। এই বাংলোয় আসার পরেই তাঁর একের পর এক ছবি সুপারহিট হতে থাকে। পরবর্তীতে কেরিয়ারে কিছুটা মন্দা দেখা দিলে তিনি বাংলোটি উদীয়মান ও নবাগত রাজেশ খান্নাকে বিক্রি করে দেন। রাজেশ খান্না সেটির নাম রাখেন ‘আশীর্বাদ’। শোনা যায়, এই বাংলোটি পরবর্তীতে রাজেশ খান্নার বর্ণাঢ্য কেরিয়ারের জন্যও অত্যন্ত লাকি প্রমাণিত হয়েছিল।

দিলীপ কুমারের ছেড়ে দেওয়া জুতোয় পা: রাজ কাপুর যখন তাঁর বহুপ্রতীক্ষিত ত্রিমুখী প্রেমের ছবির পরিকল্পনা করেন, তখন প্রথমে এর নাম রাখা হয়েছিল ‘ঘরোন্দা’, যা পরে পরিবর্তিত হয়ে ‘সঙ্গম’ হয়। এই সিনেমায় ‘গোপাল’-এর চরিত্রে কিংবদন্তি দিলীপ কুমারকে কাস্ট করতে চেয়েছিলেন রাজ কাপুর। কিন্তু দিলীপ কুমার ছবিটিতে অভিনয় করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল ছবিতে রাজ কাপুরের চরিত্রটি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। রাজ কাপুর এরপর নাকি মহানায়ক উত্তম কুমারকেও এই চরিত্রের জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু মহানায়কও সেই চরিত্রে রাজি না হলে পরবর্তীতে সেই প্রস্তাব যায় রাজেন্দ্র কুমারের কাছে। রাজেন্দ্র কুমার তাঁর সংযত এবং আবেগঘন অভিনয়ের মাধ্যমে ‘গোপাল’ চরিত্রটিকে এতটাই জীবন্ত করে তোলেন যে, অনেকেই মনে করেন ছবিটিতে তিনি খোদ রাজ কাপুরকেও দারুণভাবে টেক্কা দিয়েছিলেন। এই ছবির “ইয়ে মেরা প্রেম পত্র পড় কর..” গানটি সিনে পর্দার সর্বকালের অন্যতম সেরা রোমান্টিক গানে পরিণত হয়।

সুনীল দত্তের সঙ্গে বন্ধুত্ব থেকে আত্মীয়তা: ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ভারতীয় বিনোদন জগতে এক ঐতিহাসিক সিনেমা, যেখানে ঐতিহাসিক চরিত্রে নজর কাড়েন রাজেন্দ্র কুমার। ছবিতে তিনি রাধার (নার্গিস) বড় এবং অত্যন্ত বাধ্য ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সিনেমার একটি দৃশ্যে খড়ের গাদায় আগুন লাগার কথা থাকলেও আচমকা বাতাস বদলে যাওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং নায়িকা নার্গিস আগুনের মাঝে আটকে পড়েন। তখন বাস্তব জীবনেও সুনীল দত্ত নিজের জীবন বাজি রেখে আগুনের ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়ে নার্গিসকে উদ্ধার করেন। রাজেন্দ্র কুমারও সেটে সুনীল দত্তকে সাহায্য করতে দ্রুত ছুটে যান। এই ঘটনার পর থেকেই সুনীল দত্ত ও রাজেন্দ্র কুমারের মধ্যে এক গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে পারিবারিক আত্মীয়তায় রূপ নেয়। রাজেন্দ্র কুমারের ছেলে কুমার গৌরব পরবর্তীতে সুনীল দত্ত ও নার্গিসের কন্যা নম্রতা দত্তকে বিয়ে করেন।

সফল প্রযোজক: অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ‘লাভ স্টোরি’ (১৯৮১) এবং ‘নাম’ (১৯৮৬)-এর মতো ব্লকবাস্টার সিনেমা প্রযোজনা করে চলচ্চিত্র জগতে নিজের অনন্য দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। ‘লাভ স্টোরি’ সিনেমাটির মাধ্যমেই তিনি নিজ পুত্র কুমার গৌরবকে ইন্ডাস্ট্রিতে নায়ক হিসেবে লঞ্চ করেন।

ভারত সরকার তাঁকে চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৯৯ সালের ১২ জুলাই ৭১ বছর বয়সে ক্যান্সারের জটিলতা ও আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান অভিনেতা ও কিংবদন্তি চিরবিদায় নেন।