শহিদ দিবসের মঞ্চে তৃণমূলের চারফালি! মহুয়া মৈত্রের খোঁচায় কি ভেঙে পড়বে NCPI-এর পরিকল্পনা?

একুশে জুলাই। এই তারিখটি বাঙালির আবেগ ও রাজনীতির সমার্থক। কিন্তু এবারের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কলকাতার রাজপথ সাক্ষী হতে চলেছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক দৃশ্যের—একই দিনে শহরে পালিত হতে চলেছে মোট চারটি পৃথক শহিদ স্মরণসভা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল মঞ্চ থেকে শুরু করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহী শিবির, কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী কর্মসূচি এবং সবশেষে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন নতুন দল NCPI-এর আত্মপ্রকাশ—সব মিলিয়ে একুশে জুলাই যেন রাজনৈতিক মেরুকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
গত বছরের কথা ভাবলে এখনো অনেকের স্মৃতিতে অমলিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধর্মতলা সমাবেশের ছবি। যেখানে কাকলি ঘোষ দস্তিদার, দেব, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা সায়নী ঘোষের মতো মুখেরা মঞ্চ আলো করে থাকতেন। পাশে থাকতেন ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস বা চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের মতো দাপুটে নেতারা। আজ সেই ছবি অতীত। পালাবদলের হাওয়া আর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে তৃণমূল আজ চার ভাগে বিভক্ত।
ইতিমধ্যেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়রা গান্ধীমূর্তির পাদদেশে কর্মসূচির প্রস্তুতি শুরু করেছেন। অন্যদিকে, কালীঘাট শিবির বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে মূল সভার জন্য অনুমতি পেয়েছে, যেখানে প্রধান বক্তা স্বয়ং নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই প্রেক্ষাপটে বড় প্রশ্ন ছিল, বিদ্রোহ ঘোষণা করে যে কুড়িজন সাংসদ NCPI গঠন করেছেন, তাঁদের অবস্থান ঠিক কী?
অবশেষে সেই ধোঁয়াশা কাটালেন সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “শহিদ সবার। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী হোন কিংবা বাংলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রাণ দেওয়া কোনো ব্যক্তি, তাঁদের সম্মান জানানো আমাদের নৈতিক কর্তব্য। বিশেষ করে আমরা যারা রাজনীতি করি, শহিদ মিনার বা গান্ধীমূর্তির বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে পৃথিবীর সকল শহিদদের সম্মান জানানোই আমাদের উদ্দেশ্য।”
তবে NCPI-এর এই অবস্থানকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে নারাজ কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তিনি তীক্ষ্ণ আক্রমণ শানিয়ে বলেন, “এই কুড়িজন সাংসদ আদৌ একুশে জুলাই বাংলায় থাকবেন তো? আমি তাঁদের জিজ্ঞেস করতে চাই। যদি থাকেন, তবে কি তাঁরা আরও একটা নতুন জায়গায় অনুমতি নেবেন? কারণ তাঁরা তো ঋতব্রত গ্যাংয়ের অংশ নন। বাংলার মানুষ আজ এক আজব সার্কাস দেখছেন। তৃণমূলের অবস্থান একই—যেখানে ছিলাম, সেখানেই আছি।”
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তিলোত্তমার রাস্তায় এই চারমুখী শহিদ স্মরণ আসলে তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্বের এক নগ্ন প্রতিফলন। শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আড়ালে আসলে চলছে নিজেদের শক্তির প্রদর্শন। একুশে জুলাইয়ের মাহাত্ম্য কি এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় ম্লান হয়ে যাবে? নাকি ভিন্ন ভিন্ন মঞ্চ থেকে একই শহিদদের স্মরণে ধ্বনিত হবে এক সুর? তা দেখার অপেক্ষায় এখন রাজ্যবাসী।