‘শয়তানের দূত’ নাকি অদম্য নাবিক? ১২০০ বছর আগে ভাইকিংদের আসল ইতিহাস জানেন কি?

খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর শেষ ভাগ। ইউরোপের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ তখনো কল্পনাও করতে পারেনি যে, সমুদ্রের দিগন্ত রেখা পেরিয়ে এমন এক মহাশক্তি ধেয়ে আসছে, যা আগামী ৩০০ বছর পুরো মহাদেশকে আতঙ্কের চাদরে মুড়ে রাখবে।
৭九৩ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুন। ইংল্যান্ডের লিন্ডিসফার্নে (Lindisfarne) নামক এক পবিত্র মঠে আচমকা হানা দেয় একদল সামুদ্রিক দস্যু। যাজকদের নির্মমভাবে হত্যা, চার্চের পবিত্র সম্পদ লুটপাট আর আগুনে সব ছাই করে দেওয়ার মধ্য দিয়েই ইতিহাসের পাতায় শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়— যার নাম ‘ভাইকিং যুগ’ (Viking Age)। আজ থেকে প্রায় বারোশো বছর আগের সেই কালপঞ্জি বর্বরতা আর বীরত্বের এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
দিগ্বিজয়ী যোদ্ধা নাকি নির্মম দস্যু?
বর্তমান নরওয়ে, ডেনমার্ক ও সুইডেন অর্থাৎ স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের এই অধিবাসীদের মূল পরিচয় ছিল তারা ‘নর্স’ (Norse) বা উত্তরদেশীয় মানুষ। নর্স ভাষায় ‘ভাইকিং’ শব্দের অর্থ কোনো জাতি নয়, বরং এটি ছিল একটি পেশা। যার মানে ‘সমুদ্রে অভিযানে যাওয়া’ বা ‘লুটপাট করা’।
নিজেদের অনুর্বর মাটি, তীব্র জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর সম্পদের লোভেই মূলত এই পৌত্তলিক (Pagan) যোদ্ধারা খ্রিষ্টান অধ্যুষিত ইউরোপের বুকে এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
সীমাহীন বর্বরতা: কেন তাদের বলা হতো ‘ঈশ্বরের অভিশাপ’?
সমসাময়িক খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকরা ভাইকিংদের ‘শয়তানের দূত’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তাদের এই কুখ্যাত হয়ে ওঠার পেছনে ছিল কিছু হাড়হিম করা চর্চা:
১. লংশিপের জাদু ও আকস্মিক আক্রমণ
ভাইকিংদের মূল শক্তি ছিল তাদের তৈরি বিশেষ হালকা ও দ্রুতগামী নৌকা, যা ‘লংশিপ’ (Longship) নামে পরিচিত। এই নৌকাগুলো এতটাই অগভীর ছিল যে সমুদ্রের পাশাপাশি খুব সহজে নদীর ভেতরের কম পানিতেও চলতে পারত। ফলে কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই তারা ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের ভেতরের শহরগুলোতে ঢুকে পড়ে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা করত এবং ধন-সম্পদ লুটে পালিয়ে যেত।
২. ‘ব্লাড ঈগল’ (Blood Eagle): নিষ্ঠুরতার চরম সীমা
নর্স উপাখ্যান অনুযায়ী, শত্রুর মনে চরম ভীতি তৈরি করতে ভাইকিংরা এক ভয়াবহ নির্যাতন পদ্ধতি ব্যবহার করত। এই পদ্ধতিতে জীবন্ত বন্দির পিঠ কেটে মেরুদণ্ড থেকে পাঁজরের হাড়গুলো আলাদা করে দুই পাশে ছড়িয়ে দেওয়া হতো, যা দেখতে ঈগল পাখির ডানার মতো লাগত। এরপর ফুসফুস দুটি টেনে বের করে তার ওপর লবণের গুঁড়ো ছিটিয়ে দেওয়া হতো!
৩. দাসপ্রথা ও নারীদের ওপর যৌন নিপীড়ন
অভিযানে গিয়ে তারা হাজার হাজার তরুণ-তরুণী ও নারীদের বন্দি করে নিয়ে আসত, যাদের নর্স সমাজে ‘থ্রল’ (Thralls) বা দাস বলা হতো। এই বন্দি নারীদের ওপর চলত চরম নির্যাতন। এমনকি ভাইকিং সর্দারদের মৃত্যুর পর তাদের পরকালের সঙ্গী করার নামে দাসীদের মাদক খাইয়ে, গণধর্ষণ শেষে জীবন্ত পুড়িয়ে বা কবর দিয়ে হত্যা করা হতো। আরব পরিব্রাজক ইবনে ফাদলানের ডায়েরিতেও এই বর্বরতার নিখুঁত চিত্র মিলেছে।
৪. ‘বারসার্কার’ উন্মাদনা
যুদ্ধক্ষেত্রে ভাইকিংদের আরেকটি রূপ ছিল ভয়ঙ্কর, যা ‘বারসার্কার’ (Berserkers) নামে পরিচিত। এরা ছিল এমন এক বিশেষ যোদ্ধা দল, যারা যুদ্ধের আগে কোনো বর্ম ছাড়াই কেবল ভালুক বা নেকড়ের চামড়া গায়ে দিয়ে এক ধরণের তীব্র ঘোরের মধ্যে চলে যেত। তারা কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করত, নেকড়ের মতো গর্জন করত এবং শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে নিজেদের ঢাল কামড়ে ধরে রাখত। আধুনিক গবেষকদের মতে, ‘Amanita muscaria’ নামক বিশেষ এক পাহাড়ি মাশরুম বা ভেষজ খাওয়ার ফলে তাদের শরীরে এক উন্মাদনা তৈরি হতো এবং ব্যথাবোধ চলে যেত।
মুদ্রার ওপিঠ: বাণিজ্য, নেভিগেশন ও নতুন বিশ্ব আবিষ্কার
ইতিহাসের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো, যে ভাইকিংরা ইউরোপ জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছিল, তারাই আবার পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিচ্ছিল তাদের অসামান্য নৌচালনা ও বাণিজ্য দক্ষতার মাধ্যমে।
বিশ্ব বাণিজ্যে আধিপত্য: ভাইকিংরা কেবল লুটেরা ছিল না, তারা ছিল অত্যন্ত চতুর ব্যবসায়ী। তাদের বাণিজ্য পথ রাশিয়ার ভলগা নদী হয়ে দূরবর্তী কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) ও বাগদাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে হাজার হাজার প্রাচীন ইসলামিক রূপার মুদ্রা পাওয়া গেছে, যা তাদের এই বিশাল বাণিজ্য নেটওয়ার্কের প্রমাণ।
কলম্বাসের ৫০০ বছর আগেই আমেরিকা জয়: কোনো আধুনিক কম্পাস ছাড়াই কেবল সূর্য, তারা ও সমুদ্রের পাখির গতিবিধি লক্ষ্য করে তারা আটলান্টিক মহাসাগর জয় করেছিল। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের প্রায় ৫০০ বছর আগে, ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে লিফ এরিকসন (Leif Erikson) নামক এক ভাইকিং নাবিক উত্তর আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে (বর্তমান কানাডা) পৌঁছেছিলেন।
তরবারি থেকে ক্রুশ: যেভাবে শেষ হলো ভাইকিং যুগ
একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে তিনটি প্রধান কারণে ভাইকিং যুগের অবসান ঘটে:
১. খ্রিস্টধর্মের বিস্তার: স্ক্যান্ডিনেভিয়ার রাজারা ধীরে ধীরে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পর চার্চের ওপর আক্রমণ ও খ্রিষ্টানদের দাস বানানোর প্রথা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ২. প্রতিরোধ ব্যবস্থা: ইউরোপের বাকি দেশগুলো ভাইকিংদের ঠেকাতে নিজেদের সামরিক ব্যবস্থা ও দুর্গ প্রথা উন্নত করে। ৩. স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধ (১০৬৬ খ্রিস্টাব্দ): এই যুদ্ধের সেপ্টেম্বর মাসে ইংল্যান্ডের স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে নরওয়ের রাজা হারাল্ড হার্ডরাডা পরাজিত ও নিহত হন। এই ঘটনাকেই ভাইকিং যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ধরা হয়।
পরিশেষ: আজকের নরওয়ে, সুইডেন বা ডেনমার্ক বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল দেশ। অথচ তাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস ছিল রক্ত আর লুণ্ঠনে ঘেরা। বর্বরতা আর বীরত্ব, ধ্বংস আর সৃষ্টি— এই দুই বিপরীতমুখী সত্তার এক জটিল মিশ্রণই হলো ভাইকিং এজ, যা আজও বিশ্ববাসীকে সমানভাবে রোমাঞ্চিত করে।