মায়ের ব্রহ্মশিলায় হাত দেওয়া নিষিদ্ধ! তারাপীঠে কেন হঠাৎ কড়াকড়ি? জেনে নিন নতুন নিয়মাবলী

তন্ত্রসাধনার অন্যতম পীঠস্থান তারাপীঠ। দ্বারকা নদের তীরে অবস্থিত এই মন্দিরে মা তারার আরাধনায় এতদিন এক বিশেষ প্রথা প্রচলিত ছিল। ভক্তরা সেবাইতদের মাধ্যমে গর্ভগৃহে প্রবেশ করে মায়ের ব্রহ্মশিলা রূপ স্পর্শ করতে পারতেন। নিজের হাতে মায়ের পায়ে ফুল-বেলপাতা দেওয়া বা ব্রহ্মশিলায় জবা ছোঁয়ানো ছিল তারাপীঠের প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু মন্দিরের প্রাচীন বিগ্রহের সুরক্ষা ও ভক্তদের ভিড় নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এবার সেই দীর্ঘদিনের প্রথায় বড়সড় পরিবর্তন আনল মন্দির কমিটি। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর সর্বসম্মতিক্রমে পাঁচটি নতুন নিয়ম লাগু করা হয়েছে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে সাধারণ ভক্তদের গর্ভগৃহে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রুপোর দরজার বাইরে নতুন রেলিং বসানো হয়েছে, সেখান থেকেই মা-কে দর্শন করতে হবে। স্পর্শ দর্শন বন্ধ হওয়ায় ভক্তরা আর সরাসরি বিগ্রহ স্পর্শ করতে পারবেন না। পুজো সামগ্রী সেবাইতদের হাতে তুলে দিতে হবে এবং তাঁরাই মায়ের কাছে তা নিবেদন করবেন। দর্শনের সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে; ভিড় কমাতে প্রতিটি ভক্তকে মাত্র ১০-১৫ সেকেন্ড সময় দেওয়া হবে। মন্দিরে ছবি তোলা বা ভিডিও করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া কৌশিকী অমাবস্যার মতো বিশেষ দিনগুলিতে অনলাইন পাস সিস্টেম চালুর ভাবনা রয়েছে। ডালার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি করা হয়েছে—ফল-মিষ্টি ছাড়া সিঁদুর, আলতা বা নকল গয়না নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করা যাবে না।

কিন্তু কেন এই কঠিন সিদ্ধান্ত? মন্দির কমিটির মতে, মূলত তিনটি কারণ এর নেপথ্যে রয়েছে। প্রথমত, বিগ্রহের সুরক্ষা। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ২০২৫ সালের রিপোর্টে জানানো হয় যে, লক্ষাধিক ভক্তের স্পর্শ, ঘাম ও সিঁদুরের প্রলেপে মায়ের প্রাচীন ব্রহ্মশিলা মূর্তির অবয়ব মারাত্মকভাবে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এভাবেই চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিগ্রহের মূল গঠন নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ। অমাবস্যা বা ছুটির দিনে ২-৩ লক্ষ মানুষের সমাগমে গর্ভগৃহের ভেতরে যে পদপিষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, তা রুখতেই এই সিদ্ধান্ত। তৃতীয়ত, দুর্নীতির অবসান। অনেক ভক্তের অভিযোগ ছিল, পান্ডাদের মোটা টাকা দিলেই ভিআইপি সুবিধা পাওয়া যায়, যা সাধারণ ভক্তদের বঞ্চিত করে। নতুন নিয়মে সবাই সমান সুযোগ পাবেন।

মন্দির কমিটির এই সিদ্ধান্তে ভক্তদের মনে আক্ষেপ থাকলেও শাস্ত্রজ্ঞরা বলছেন, “দর্শনাদেব পুনাতি”—অর্থাৎ দূর থেকে মা-কে দেখলেই পাপ নাশ হয়। ভক্তদের জন্য মন্দিরের ওয়েবসাইটে লাইভ দর্শনের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। এছাড়া তারাপীঠ মহাশ্মশানে অবস্থিত বামাক্ষ্যাপার সমাধিতে ছোঁয়ার ওপর কোনো বাধা নেই, ভক্তরা সেখানে গিয়েও প্রার্থনা করতে পারেন। মা তারার আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য স্পর্শের চেয়েও ভক্তির পবিত্রতা বেশি জরুরি।