মিলানে মার্কিন দূতাবাস তৈরির আড়ালে ভয়াবহ দাসপ্রথা! ভারতীয় শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে

ইতালির মিলানে ৩৫ কোটি ডলার ব্যয়ে মার্কিন দূতাবাসের নতুন ভবন তৈরির কাজ চলছে। কিন্তু এই নির্মাণ প্রকল্পের আড়ালেই উঠে এসেছে শ্রম শোষণের এক ভয়াবহ চিত্র। মার্কিন নির্মাণ সংস্থা ‘ক্যাডেল কনস্ট্রাকশনস’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা ভারত ও কেনিয়া থেকে আসা শ্রমিকদের সাথে চূড়ান্ত প্রতারণা করেছে। ভালো বেতনের লোভ দেখিয়ে ইতালিতে এনে শ্রমিকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমানবিক পরিশ্রম করানো এবং মজুরি থেকে বেআইনিভাবে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই সংস্থার বিরুদ্ধে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বঞ্চনার ঘটনায় ইতালীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলো নড়েচড়ে বসেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে দুই ইতালীয় ব্যবস্থাপককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে জানা গেছে, কোম্পানির এক কর্মকর্তা দেশ ছাড়ার চেষ্টাও করেছিলেন। গত ছয় মাস ধরে এই তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে এবং তাতে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রায় ৭০ জন শ্রমিক, যাদের বড় অংশই ভারতীয়, এই শোষণের শিকার হয়েছেন।
প্রতারণার জালটি ছিল বেশ গভীর। শ্রমিকদের মাসে ২,৫০০ ইউরো বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, বাস্তবে তাদের হাতে আসত মাত্র ৫০০ ইউরো (প্রায় ৫৮০ ডলার)। কাজ করতে হতো সপ্তাহে ছয় দিন, দিনে ১০ ঘণ্টা করে। অথচ মিলানের নিয়ম অনুযায়ী, একজন নির্মাণ শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১৩.৩৯ ইউরো হওয়ার কথা। সেখানে এই শ্রমিকদের ঘণ্টাপ্রতি মজুরি দেওয়া হচ্ছিল মাত্র ১.৫৫ ইউরো! অভিযোগ, কাজের ফাঁকে সামান্য বিশ্রাম তো দূরের কথা, থাকার জায়গা ও খাবারের খরচের নামেও বেতনের টাকা কেটে নেওয়া হতো।
একজন ভারতীয় শ্রমিক, যিনি এর আগে উপসাগরীয় দেশগুলোতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন, তিনি ক্ষোভের সাথে জানান, প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্ত বেতনের মধ্যে বিশাল ফারাক দেখে প্রতিবাদ করলে তাকে কাজ ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে কেনিয়ার শ্রমিকদেরও। কোনো উপায় না দেখে তাঁরা পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে বাধ্য হন।
বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে পৌঁছালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নড়েচড়ে বসেছে। তারা জানিয়েছে, শ্রম শোষণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ‘শূন্য-সহনশীলতা’। ইতালীয় কর্তৃপক্ষের সাথে তারা এই বিষয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। অন্যদিকে, ‘ক্যাডেল কনস্ট্রাকশনস’ দাবি করেছে যে তারা তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে। আদালতের নির্দেশে বর্তমানে নির্মাণ কাজ চলছে এবং শ্রমিকদের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তাঁদের এখন সপ্তাহে দুই দিন ছুটি এবং নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সংগঠনের দাবি, এইটুকু সুরাহাতেই তারা সন্তুষ্ট নয়। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বিনা কারণে বরখাস্ত হওয়া শ্রমিকদের জন্য অবিলম্বে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন তাঁরা। আধুনিক সভ্যতার এই যুগে একটি মার্কিন প্রকল্পের কাজ করতে এসে শ্রমিকদের এই দশা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।