সীমান্তে মহাপ্রলয়! নদীর জলস্তর একলাফে বাড়ল ৯ মিটার, নেপালের এই হাড়হিম করা বিপর্যয়ে কাঠগড়ায় চিন!

২৬ আগস্টের সকালে তিব্বত সীমান্ত থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর আর জলের এক সর্বগ্রাসী স্রোত মুহূর্তের মধ্যে তছনছ করে দিয়েছে নেপাল ও চিনের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ জনপদ। লাহেন্ধে খোলা দিয়ে শুরু হওয়া এই বন্যা রসুওয়াগড়ি হয়ে ভোটকোশি ও ত্রিশূলী নদীতে আছড়ে পড়ে, মাত্র আধঘণ্টার ব্যবধানে নদীর জলস্তর বাড়িয়ে দেয় প্রায় ৯ মিটার। এই বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাসে গুঁড়িয়ে গিয়েছে চিনের জিরং চেকপয়েন্ট ও নেপালের কাস্টমস পোস্ট, ভেসে গিয়েছে ৩২টি সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়কপথ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যার ফলে নেপালের জাতীয় গ্রিড থেকে নিমেষেই উধাও হয়ে গেছে ৪৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দুই দেশ মিলিয়ে এগারোশোর বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর মিলেছে এবং প্রায় চার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ।
চিনের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের বিস্ফোরক অভিযোগ
এই মর্মান্তিক ঘটনার পরেই ফের চিনের তথ্য গোপন করার পুরনো প্রবণতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও বন্যার ১২ দিন আগেই চিনের আবহাওয়া দপ্তর প্রবল বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে কাঠমান্ডুকে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিল, তবুও নেপালের অভিযোগ অন্য জায়গায়। কাঠমান্ডুর আবহাওয়া ও জলবিজ্ঞান দপ্তর স্পষ্ট জানিয়েছে, চিন কেবল বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেয়, কিন্তু নদীর তাৎক্ষণিক জলস্তর, ভূমিধস বা আকস্মিক তুষারধসের মতো রিয়েল-টাইম বা লাইভ তথ্য ভাগ করে না। অথচ গোটা হিমালয় অববাহিকায় সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি হিমবাহ হ্রদের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি চিনের তিব্বত অংশেই অবস্থিত।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রিয়েল-টাইম তথ্য না দেওয়ার এই অনীহা স্রেফ নজরদারির অভাব নয়, বরং সীমান্তের কৌশলগত গোপনীয়তা বজায় রাখার চিনা প্রচেষ্টা। অতীতে মেকং নদীর ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে, দুই দশক আলোচনার পরেও ভাটির দেশগুলিকে পুরো তথ্য না দিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রেখে দিয়েছে বেইজিং। বিপর্যয়ের পরপরই চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং তৎপরতা চালালেও এবং জিরং কাউন্টিতে পাঁচশোর বেশি চিনা নাগরিক নিখোঁজ হলেও, তিব্বতে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বন্যার ভিডিও মুছে ফেলা এবং ক্ষয়ক্ষতির খবর ধামাচাপা দেওয়ার চিনা চক্রান্ত বুঝিয়ে দিচ্ছে যে স্বচ্ছ তথ্য আদানপ্রদানের বদলে গোপনীয়তার পথেই হাঁটছে বেজিং।
অর্থনৈতিক ও জলবায়ু সংকটের মুখে নেপাল
প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের পুনর্গঠন খরচের মুখে দাঁড়িয়ে কাঠমান্ডু এবার আন্তর্জাতিক স্তরে ক্ষতিপূরণ ও জলবায়ু ন্যায়ের দাবিতে সরব হয়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য নেপালের দায় নামমাত্র হলেও তাদের ভুগতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ফলে কার্বন নির্গমনকারী দেশ হিসেবে এবং ভঙ্গুর হিমালয় ঢালে একের পর এক ভারী পরিকাঠামো নির্মাণকারী শক্তি হিসেবে চিনের দায়বদ্ধতার দিকেই সরাসরি আঙুল উঠছে।