বিংশ শতকে কলকাতার বাবুদের ‘হাওয়াবদলের’ প্রিয় ঠিকানা ছিল ঝাড়খণ্ডের শিমুলতলা। ডাক্তার, উকিল বা জমিদার—সবাই গরমের ছুটি কাটাতে ছুটতেন এই ছোট্ট স্টেশন টাউনে। একবিংশ শতকের এসি-মলের যুগে সেই জৌলুস হয়তো ফিকে হয়েছে, কিন্তু বর্ষায় শিমুলতলার আত্মা আজও অবিকল ‘আরণ্যক’-এর মতো জীবন্ত।
সময় থমকে থাকা এক শহর: শিমুলতলা মানেই শাল-পিয়াল জঙ্গলের হাতছানি, পরিত্যক্ত রাজবাড়ি আর সাহেবি বাংলো। দেবেন্দ্র ভিলা থেকে নন্দলাল ভিলা—প্রতিটি কোণ যেন ১৯৩০ সালের কোনো সিনেমার সেট। বর্ষার কুয়াশায় যখন এই পরিত্যক্ত বাংলোগুলো ঢাকা পড়ে, তখন মনে হয় টাইম মেশিনে চড়ে যেন আপনি গত শতাব্দীতে ফিরে গেছেন।
বর্ষায় শিমুলতলার ৩টি অমোঘ আকর্ষণ:
পরিত্যক্ত রাজবাড়ি: সাহেবি আমলের ফ্লোর টাইলস, ভাঙা ঝাড়বাতি আর উঁচু সিলিং—ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়িগুলো ক্যামেরা বন্দি করার জন্য সেরা জায়গা।
লাটু পাহাড় ও ধারারা ফলস: বর্ষায় লাটু পাহাড়ের রূপ মোহময়। ৪ কিমি দূরের ধারারা ফলস যখন ১৪৭ ফুট উপর থেকে আছড়ে পড়ে, তখন ভিজে মাটির গন্ধে শহরের সব ক্লান্তি ধুয়ে যায়।
শাল-সেগুনের জঙ্গল: মোবাইল নেটওয়ার্কের কোলাহলমুক্ত এই জঙ্গল পথে হাঁটতে হাঁটতে কানে আসবে শুধু পাখির ডাক। ভাগ্য ভালো থাকলে সকালে হরিণের দেখাও মিলতে পারে।
ভ্রমণ নির্দেশিকা:
কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে সকাল ৭:১০-এর হাওড়া-জামালপুর এক্সপ্রেস ধরলে দুপুর ১:০৫-এ পৌঁছে যাবেন শিমুলতলা। ফেরার ট্রেন বিকেল ৩:২৫-এ।
থাকা ও খাওয়া: রাজবাড়ি বাংলো বা ডিএফও বাংলোতে থাকা এক দারুণ অভিজ্ঞতা। খরচও নামমাত্র (৮০০-১২০০ টাকা)। স্টেশনের ‘শিমুলতলা হোটেল’-এর সাদামাটা বাঙালি থালি আপনার তৃপ্তি মেটাবে।
মনে রাখুন ৩টি ‘সোনার নিয়ম’: ১. সন্ধ্যা ৭টার পর জঙ্গল বা পরিত্যক্ত বাংলোর আশেপাশে একলা ঘোরাঘুরি এড়িয়ে চলুন। ২. নেটওয়ার্ক খুব একটা ভালো নেই, তাই অফলাইন ম্যাপ ডাউনলোড করে রাখা জরুরি। ৩. জঙ্গলের ভেতরে ঘোরার জন্য স্থানীয় গাইড নিতে ভুলবেন না।
শেষ কথা: দার্জিলিং-এর ভিড় বা দিঘির কোলাহল নয়, শিমুলতলা আপনাকে দেবে নিজের সাথে কাটানোর নিরালা মুহূর্ত। বিংশ শতকের বাবুরা এখানে এসে প্রাণ ফিরে পেতেন, আপনি আসুন মন ভালো করতে। এই বর্ষায় শিমুলতলার লাল মোরামের রাস্তা আর মেঘের আনাগোনা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।





