পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পালাবদল এবং প্রশাসনিক কঠোরতার প্রভাব এবার সরাসরি দৃশ্যমান রাজ্যের সীমান্তগুলোতে। মঙ্গলবার থেকে কলকাতার অদূরে হাকিমপুর সীমান্ত চেকপোস্টে যেন ভিড় বাড়ছে বাংলাদেশি নাগরিকদের। অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে এদের মধ্যে অনেককে আটক করে সরকারি ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা অস্থায়ী শিবিরে স্থানান্তর করা হয়েছে। তাদের নথিপত্র যাচাই করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ বা বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু এই পরিস্থিতির চেয়েও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশাসনের ক্যামেরার সামনে অনুপ্রবেশকারীদের দেওয়া বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি।
দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি যে অভিযোগ তুলে আসছিল, এদিন অনুপ্রবেশকারীদের মুখেই তার প্রতিধ্বনি শোনা গেল। ভোটের রাজনীতির জন্য তাদের ব্যবহার করা এবং সরকারি নথিপত্র জোগাড় করে দেওয়ার অভিযোগ সরাসরি উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে।
আধার-রেশন কার্ড থেকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার— সবই ছিল তৃণমূলের সৌজন্যে:
খুলনা থেকে আসা রুবি বিবি অকপটে জানিয়েছেন, এতদিন তিনি দমদমে বসবাস করতেন। তাঁর কাছে ভারতের আধার কার্ড এবং রেশন কার্ড ছিল। তিনি বলেন, “তৃণমূলের স্থানীয় নেতারাই এই নথিপত্র তৈরি করে দিয়েছিলেন। আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল—কোনো সমস্যা হবে না। আমরা সরকারি সুবিধা হিসেবে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের টাকাও পেতাম। কিন্তু সরকার বদলানোর পর এখন পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়েছে।”
যশোরের বাসিন্দা সন্তু মোল্লা আরও এগিয়ে গিয়ে দাবি করেন, গত নয় বছর ধরে তিনি ভারতে থাকছেন এবং নিয়মিত ভোটও দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “তৃণমূল নেতারা আমাদের ভোটার আইডি তৈরি করে দিয়েছিলেন। আমাদের নিশ্চিত করা হয়েছিল যে দিদিই আবার ক্ষমতায় ফিরবেন। কিন্তু এবার নতুন সরকারের কড়াকড়িতে আমাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন পুলিশের ভয়ে আমরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছি।” ফরাদ শেখ নামে আরেকজন সরাসরি বলেন, “তৃণমূল আমাদের ভোটার কার্ড বানিয়ে দিয়েছে, বিনিময়ে আমরা তাদের ভোট দিয়েছি।”
দালালচক্র ও হোল্ডিং সেন্টারে কড়াকড়ি:
সীমান্ত পারাপারে দালালচক্রের সক্রিয়তাও স্পষ্ট হয়েছে। যশোরের আক্তারুল মোল্লা জানান, চার বছর আগে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি সীমান্ত পার হয়ে দমদমে রঙের মিস্ত্রির কাজ করতেন। একই কথা শোনা গেছে সিরাজুল নামে আরেক ব্যক্তির গলায়, যিনি ৫ বছর আগে ছয় হাজার টাকা দিয়ে সীমান্ত পার হয়েছিলেন।
বর্তমানে হাকিমপুর এলাকার হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে ২০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে রাখা হয়েছে। শুভেন্দু সরকারের কড়া নির্দেশে পুলিশ প্রশাসন এখন কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নয়। এই ঘটনা রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূলের ‘ভোটব্যাঙ্ক’ রাজনীতি নিয়ে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা আগামী দিনে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।





