বুধবার সকালে কলকাতার হিন্দুস্তান পার্কের নিজের বাসভবনের ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হলো বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্তের। এই অকাল প্রয়াণে শোকস্তব্ধ গোটা চলচ্চিত্র জগত। সূত্রের খবর, তাঁকে সঙ্কটজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকুরিয়ার এক বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যার ঘটনা বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, যদিও ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিবার সূত্রে খবর, পরিচালকের মেয়ে ঐশী বিদেশ থেকে ফিরলে শুক্রবার তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। পিস হেভেন থেকে মরদেহ প্রথমে নিয়ে যাওয়া হবে সত্যজিৎ রায়ের বাসভবনের সামনে, এরপর কেওড়াতলা শ্মশানে শেষযাত্রা সম্পন্ন হবে। শেষকৃত্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উপস্থিত থাকতে পারেন বলে জানা গিয়েছে।
অনীক দত্তের প্রয়াণে রাজনৈতিক মহলেও শোকের আবহ। সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ তাঁকে এক আপসহীন বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্মরণ করেছেন। শতরূপ বলেন, “অনীক দা পনিরের মতো ছিলেন না যে, যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেবেন। তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বরাবরই সরব ছিলেন। বামফ্রন্ট সরকারের সময় কোনো বাড়তি সুবিধা নেননি, আবার পরবর্তী সময়ে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের মতো নিজের বুদ্ধি বাজারে বিক্রি করেননি।” শতরূপের কথায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে নন্দনে সিনেমা রিলিজ না পাওয়া থেকে শুরু করে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ সিনেমা হল থেকে তুলে নেওয়ার বিতর্ক—সব ক্ষেত্রেই অনীক দত্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে তবেই তাঁকে সিনেমা প্রদর্শনের অধিকার আদায় করতে হয়েছিল।
পরিচালকের মানসিক অবসাদ প্রসঙ্গে শতরূপ বলেন, “জানতাম তিনি অবসাদে ভুগছেন, কিন্তু এমন পরিণতি হবে ভাবিনি। এখন নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে যে আরও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা উচিত ছিল।” গত কয়েকদিনে পরিচালকের ফেসবুক পোস্টগুলো গুরুত্ব সহকারে না দেখাটাও এখন পীড়া দিচ্ছে তাঁকে। শতরূপ আরও জানান, ‘যত কাণ্ড কলকাতায়’ মুক্তির পর তিনি আর ছবি না বানানোর কথা বলেছিলেন, পরে অবশ্য মানসিক স্থিরতা ফিরে পেয়ে নতুন ছবির কাজে হাত দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
বাম নেতা মহম্মদ সেলিমও এই মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “তাঁর কাছ থেকে আমরা আরও সৃজনশীল কাজ পাওয়ার আশা করেছিলাম। আজ আমরা আশাহত।” সেলিমের মতে, বিগত পনেরো বছর ধরে রাজ্যের সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র জগত যেভাবে রাজনৈতিক জটিলতার শিকার হয়েছে, অনীক দত্তের ক্ষেত্রে তার প্রভাব অনস্বীকার্য। সিনেমার মুক্তি নিয়ে যে জটিলতা তৈরি করা হয়েছিল, সেলিম মনে করেন সেই ‘ভূত’ ভবিষ্যতে শাসকদলকে তাড়া করবে। এক সাহসী, সত্যবাদী এবং আপসহীন শিল্পীকে হারিয়ে বাংলা সিনেমা আজ এক বড় অভিভাবক হারাল।





